সুন্দরবন এখনো আমাদের শেষ ভরসা

ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
বাংলাদেশের বিখ্যাত বন্যপ্রাণী গবেষক ড. রেজা খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর দীর্ঘদিন বড় দায়িত্ব পালন করেছেন আরব আমিরাতের চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে। চিরতরুণ মানুষটি এখনো ব্যস্ত দেশের বন্যপ্রাণীর লাল তালিকা তৈরিসহ আরও নানা গবেষণার কাজে। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইশতিয়াক হাসান।
এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীদের যে রেড লিস্ট বা লাল তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে, সেটির টিম লিডার বা ডিফ্যাক্টো টেকনিক্যাল হেড হিসেবে আছি। ২০০০ সালে প্রথম একটি রেড লিস্ট হলেও আইইউসিএনের রীতিনীতি পুরোপুরি মেনে তা করা সম্ভব হয়নি। তখন এত ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজিস্ট, ফটোগ্রাফার বা আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ ছিল না। তাই কাজটা কিছুটা অগোছালো হয়। বন বিভাগ হালকাভাবে যুক্ত থাকলেও জার্মান ডোনার এজেন্সিই মূল কাজটি করেছিল।
এরপর বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার রেড লিস্ট করা হয়। এবার যখন আমি আরব আমিরাত থেকে স্থায়ীভাবে দেশে এলাম, ঠিক সে সময়েই নতুন প্রজেক্টের প্রস্তাব ডেভেলপ করা হয়। এ বছরের এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছি। বনানীতে নতুন অফিস নেওয়া হয়েছে।
এই কাজ ছাড়াও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত আমার যে বইগুলো আউট অব প্রিন্ট, সেগুলো নতুন করে রিভাইজ বা সংশোধনের কাজ করছি। পাশাপাশি হাতিসহ বন্যপ্রাণী সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, প্রশিক্ষণেও থাকার চেষ্টা করি।
আরব আমিরাত থেকে স্থায়ীভাবে চলে এসেছেন বললেন। সেখানকার চিড়িয়াখানায় প্রধান হিসেবে ছিলেন শুনেছি। যোগ দিয়েছিলেন কীভাবে?
প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. সলিম আলী স্যারের পাঠানো একটি মেসেজ আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘পেট্রো ডলার তোমাকে ডাকছে।’ ড. সলিম আলী আবুধাবি সফরে গিয়ে আল-আইন জু কর্তৃপক্ষের কাছে আমার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। শর্টলিস্টেড তিনজনের মধ্যে শেষমেশ আমি নির্বাচিত হই এবং এভাবেই আমার প্রবাসজীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
আল-আইন জুর কিউরেটর হিসেবে যখন আরব আমিরাতের উদ্দেশে রওনা হই, তখন পকেটে ছিল মাত্র ৫০ ডলার, তাও আবার ধার করা। বড় ছেলে তখন সিক্সথ গ্রেডে, মেয়ে ফার্স্ট গ্রেডে এবং সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র তিন বছর। পরিবারসহ আমরা চিড়িয়াখানার ভেতরেই থাকতাম। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী ইউএইতে চাকরির ভিসা হতে ছয় মাস সময় লাগত। তাই ওই ছয় মাস চারপাশের মানুষ এবং সহকর্মীরা আর্থিকভাবে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন।
শুনেছিলাম, আবুধাবি ও দুবাইয়ের স্কুলে বাংলা চালুর ক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা আছে।
ওটা মূলত আমার স্ত্রীর কাজ। আল-আইনে কাজ করার সময় দেখলাম, প্রবাসী বাঙালি ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে উর্দু বা হিন্দিতে কথা বলছে। আমার স্ত্রী নুরুন নাহার হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে আমার সহপাঠী এবং জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজের প্রাণীবিদ্যার প্রথম মহিলা শিক্ষক, তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে বাংলা ক্লাস চালুর ব্যবস্থা করেন এবং দেশ থেকে বইপত্র জোগাড় করে, ফটোকপি ও বাঁধাই করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ১৫ বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বই বিতরণ করেন। এভাবে তিনি একজন প্রাণিবিদ থেকে নিজেকে নিবেদিতপ্রাণ বাংলা শিক্ষকে পরিণত করেন। আল-আইন ছেড়ে দুবাই চিড়িয়াখানার প্রধান হিসেবে যোগ দেওয়ার পর দুবাইয়ের সেন্ট্রাল স্কুলেও বাংলা ভাষা চালুর ক্ষেত্রে আমার স্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দুবাইয়ের মাটিতে আমরা একটি ভাঁজ করা যায় এমন কাঠের শহীদ মিনারও নির্মাণ করেছি, সেখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হতো।
দুবাই চিড়িয়াখানায় চাকরি কেমন ছিল?
দুবাই চিড়িয়াখানার অফারটা আমি আশাও করিনি। হুট করে আমার কাছে ইন্টারভিউ লেটার চলে আসে। ওখানকার নিয়ম অনুযায়ী তখন পুরান চাকরি ছাড়লে এক মাসের বেতন দিয়ে চাকরি শেষ করতে হতো এবং পাসপোর্টে ছয় মাসের ‘নো এন্ট্রি’ সিল দিয়ে দেওয়া হতো। সব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। ইন্টারভিউ বোর্ডে একাধিকবার আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অফিস টাইমের পরে আমি কী করব? বলেছিলাম, আমি একজন লেখক, বই লিখি, পত্রিকায় আর্টিকেল লিখি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছিল, আমি বাইরে অন্য কোনো অননুমোদিত কাজ করব কি না।
সালিম স্যার নীলগিরির জঙ্গলে সরাসরি চলে গিয়েছিলেন আমার কাজ দেখতে। কোনো নতুন ছাত্রের কাজের শুরুতে এভাবে তার হাজির হওয়া অবাক করে দিয়েছিল অন্যদের। আমাকে বড় ভালোবাসতেন স্যার। যখন পিএইচডি শেষে দেশে চলে আসার কথা জানাই, তখন জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন। আমিও কাঁদতে শুরু করি
দুবাইয়ে তো সাফারি পার্ক গড়ে তুলেছিলেন?
দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুম ১৫ কোটি দিরহামের বাজেট অনুমোদন করেছিলেন পার্কের জন্য। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের তিনজন মিলে নকশা তৈরি করি সাফারি পার্কের। মাস্টারপ্ল্যানের কাজ চলে ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত। ২০১২ সালে জমি বরাদ্দ হলো। দুবাই চিড়িয়াখানার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আমি ছিলাম সাফারি পার্কের প্রধান বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ। দুবাই সাফারি পার্ক থেকে অবসরে যাই ২০২৪ সালের অক্টোবরে।
বন্যপ্রাণী, গাছপালার প্রতি আপনার আগ্রহ কি ছোটবেলা থেকেই?
আমার জন্ম ঢাকা জেলার ধামরাই থানার বালিয়া গ্রামের বড়বাড়িতে (১৯৪৭)। ছোটবেলায় আমাদের প্রধান বিনোদন ছিল নৌকায় ঘোরাঘুরি ও মাছ ধরা। আমি নিজে দোয়াইল, তেঁকোনা জাল বানাতাম। এসবের সঙ্গে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম এবং ঘুড়ি-লাটিম বানাতে পারতাম। আমাদের গ্রামের বড় পাড়ার কবরস্থানটি আশপাশের এলাকার চেয়ে বেশ উঁচু ছিল। বর্ষায় অনেক বন্যপ্রাণী আশ্রয় নিত সেখানে। ওই সময় অন্তত একবার রীতিমতো সাজসাজ রব পড়ে যেত গ্রামে। ছেলে-ছোকরার দল টেঁটা-বল্লম নিয়ে বন্যপ্রাণীর খোঁজে হামলা চালাত ওই কবরস্থানে। বুঝে না বুঝে দলে থাকতাম আমিও। তবে ওই হামলায় কোনো দিন কোনো প্রাণী মারা পড়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। দূর থেকে হৈ হৈ রব শুনেই সব পগারপার। মূলত তখনই বন্যপ্রাণীগুলোর প্রতি কৌতূহল দানা বাঁধতে শুরু করল আমার মনে।
স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় জীববিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক কীভাবে তৈরি হলো?
মানিকগঞ্জ মাল্টিপারপাস হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর দেবেন্দ্র কলেজে ভর্তি হই। আমাদের উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষক কালী নারায়ণ রায় ক্লাসে দারুণভাবে বায়োলজি নিয়ে আলোচনা করতেন। তার সঙ্গে ফিল্ড ট্রিপের সময় নয়াহাটের ঘন বনের গাছপালা ও ব্যাঙ-সাপের অভিজ্ঞতা এই জগতের প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ তৈরি করেছিল। নটর ডেম কলেজে এসে পেলাম প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব ড. দ্বিজেন শর্মাকে। তিনি উদ্ভিদবিদ্যা পড়াতেন, প্রাণিবিদ্যা পড়াতেন ফাদার টিম। দ্বিজেন শর্মা স্যারের সঙ্গে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন বিলে হেঁটে হেঁটে নিটেলা নামের শৈবাল সংগ্রহ করতাম; বিভিন্ন গাছের নাম ও তথ্য লিখে রাখতাম।
বোটানিতে আগ্রহ ছিল আপনার; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন জিওলজিতে, কেন?
নটর ডেম কলেজে বিএসসির প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সটার্নাল এসেছিলেন নুরুল ইসলাম স্যার। ভাইভায় আমাকে একটি স্লাইড দেখিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা জিওলজির এক্সটার্নাল ম্যাডাম লুৎফুন হোসেন এলে খাজা ইসমাইল সাবুদ্দিন স্যার আমাকে ডিএনএ মডেল আবিষ্কার করেন কে, তার নোবেল প্রাইজ পাওয়া ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করেন। তখন ম্যাডাম রেগে গিয়ে টেবিল চাপড়ে বলেন— ইসমাইল, তুমি কী করে এই প্রশ্ন তোমার স্টুডেন্টকে জিজ্ঞেস করতে পারো? এটা তো তোমার ইউনিভার্সিটি এমএসসি ক্লাসের স্টুডেন্টদের প্রশ্ন। ওই যে ম্যাডামের কাছে অভয় পেলাম আর বোটানির স্যারের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না, তখনই আমার চিন্তা-ভাবনায় একটি পরিবর্তন চলে আসে। শেষমেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজি ডিপার্টমেন্টেই এমএসসিতে ভর্তি হই। নটর ডেম কলেজের কঠোর পড়াশোনার সুবাদে আমি কেমিস্ট্রি, বোটানি ও জিওলজিতে পরীক্ষা দিয়ে গড়ে ৫৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে বেশ ভালো ফল করেছিলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফিল্ড ট্রিপগুলো কেমন ছিল?
বন্যপ্রাণীর প্রতি গভীর টান থাকায় আমি সবসময় ফিল্ড ট্রিপগুলোতে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। চাঁদপুরের ফিশারিজ ফিল্ড ট্রিপ এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, চা বাগান ও ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি পর্যন্ত দীর্ঘ ফিল্ড ট্রিপে আমি নিয়মিত অংশ নিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ‘আজাদ’ পত্রিকার সাপ্তাহিক ‘মুকুলের মাহফিলে’ চা বাগান, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে লেখালেখি শুরু করি। কাজী জাকের স্যার বন্যপ্রাণী পড়াতেন এবং তার কাছ থেকেও আমি ওয়াইল্ডলাইফ নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম।
শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে পরে সাংবাদিকতায় যুক্ত হলেন কীভাবে?
ছোটবেলায় মানিকগঞ্জে এসডিওর বাসায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়ে সিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন সমান ৩০০ রুপি শুনে আমার মনে হতো, শিক্ষকতাই সবচেয়ে চমৎকার পেশা। সেই স্বপ্ন থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সায়েন্স ল্যাবরেটরির পেছনের আইডিয়াল কলেজে পার্টটাইম লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করি, যেখানে প্রতি মাসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেতন পেতাম।
মানিকগঞ্জের বিভিন্ন স্থানীয় পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পর ১৯৭৪ সালের দিকে আমি সাংবাদিকতা পেশায় পুরোদমে জড়িয়ে পড়ি। পাকিস্তান আমলের পিপিআই, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাতারাতি বিপিআই (বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল)-এ রূপান্তর হয়। সেখানে আমি চিফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি এবং আইডিয়াল কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা চালিয়ে যাই।
বিপিআই-এর অফিসে যোগ দেওয়ার পর আগের চিফ রিপোর্টার মর্নিং নিউজে চলে যাওয়ায় আমাকে পুরো ডেস্ক ও রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংবাদ কাভার করার পুরো দায়িত্বটি আমার ওপর ছিল। রমনা পার্কের হেয়ার রোডের দিকের গেটের ডানপাশে একতলা ও দোতলা বিল্ডিংয়ে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর দপ্তর থেকে আমি সরাসরি বা ফোনে তথ্য নিয়ে অনেক সময় নিজেই টাইপ করে নিউজ ডেস্কে পাঠাতাম। আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে হেলিকপ্টারে ভোলা পর্যন্ত গিয়েছি এবং গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কাভার করেছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন কীভাবে?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজি বিভাগের হেড অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান স্যারের মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চাকরি হয়ে যায়। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের রেকর্ড ব্রেকিং ব্যাচ থেকে ১২-১৬ জন ফার্স্ট ক্লাস পায়। শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিলে ১৯৭৩ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউ দিতে ঢাকায় এলে জাকের স্যার আমাকে রাজশাহী না ফিরে পরদিন ডিপার্টমেন্টে দেখা করতে বলেন এবং আমার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার টাইপ করিয়ে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার মাত্র কয়েক মাস পর ১৯৭৪ সালের জুনে পিএইচডি করার জন্য ভারতে যাওয়ার স্কলারশিপ নিশ্চিত হয়ে যায়।
বিয়ের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?
আমার বিয়ের দিন নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থেকে জুবেরী হাউসের ব্যাচেলর রুমে থাকতাম। বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় খাট ও কিছু আসবাবপত্র এক সিনিয়র ভাইয়ের কাছ থেকে ৩০০ টাকায় কিনেছিলাম। সে সময় কাপড়ের চরম সংকট থাকায় লাইনে বা কোটায় শাড়ি কিনতে হতো। বিদেশ থেকে আসা টাফেটা নামে নাইলনের মতো শাড়ি তখন বেশ প্রচলিত ছিল। বিয়ের দিন, অর্থাৎ ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় মারাত্মক ঝড়-ঝঞ্ঝা ও ঘূর্ণিঝড় হওয়ায় যাতায়াত প্রায় বন্ধ ছিল। আগের দিন ব্রিটিশ আমলের একটি প্রিমিয়াম ট্যাক্সি বুক করে রেখেছিলাম। টাঙ্গাইলের রোড দিয়ে জামালপুর যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশের পানি উপচে যেন নদীর প্রপাতের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। সেই যাত্রায় আমার সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক রাহাত খান ও হারুন হাবিব।
সালিম আলীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
এটি আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বড় ফরমাল ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তিনি বম্বে ইউনিভার্সিটির অনারারি হেড অব দি অরনিথোলজি ডিপার্টমেন্ট এবং ভারতের জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত হয়েছিলেন। বম্বে থাকাকালে পিএইচডির অংশ হিসেবে নীলগিরির কুন্নুর শহরে ব্ল্যাক অ্যান্ড অরেঞ্জ ফ্লাইক্যাচার নামে একটি দুর্লভ পাখির সন্ধানে আমাকে কাজ করতে হয়েছিল। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে খাবার (নিজের বানানো সুজির হালুয়া, দুটি সিদ্ধ ডিম, গাজর ও শসা) এবং পানি নিয়ে ওই পাখিটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। টানা সাত দিন অক্লান্ত পরিশ্রম ও তীব্র হতাশার পর একদিন হঠাৎ সেই পাখিটি আমার পায়ের কাছে এসে হাজির। সালিম স্যার নীলগিরির জঙ্গলে সরাসরি চলে গিয়েছিলেন আমার কাজ দেখতে। কোনো নতুন ছাত্রের কাজের শুরুতে এভাবে তার হাজির হওয়া অবাক করে দিয়েছিল অন্যদের।
আমাকে বড় ভালোবাসতেন স্যার। যখন পিএইচডি শেষে দেশে চলে আসার কথা জানাই, তখন জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন। আমিও কাঁদতে শুরু করি। অনেকটা সময় আমরা একে অপরকে ধরে কেঁদেছিলাম। স্যার বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, তুমি থেকে যাবে। পরিবারসহ এখানেই বসবাস করবে।’
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মূল সমস্যা কী কী?
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রধান সমস্যা নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ধারণার মারাত্মক অভাব। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনে সই করা হলেও তার কোনো বাস্তবায়ন আমাদের দেশে নেই। জাতিগতভাবে আমাদের শৈশবে বা শিক্ষাজীবনে প্রকৃতি সংরক্ষণের কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব যে বিভাগটির হাতে ন্যস্ত (বন বিভাগ), তাদের মূল কাজ যেন গাছ লাগানো এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বন পরিচালনা করা।
বন বিভাগের কাঠামোর মধ্যে ওয়াইল্ডলাইফ সংরক্ষণের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। ওয়াইল্ডলাইফ ডিগ্রিধারীরা সেখানে কেরানির মতো কোণঠাসা হয়ে থাকেন। হাতি বা বাঘের মতো বড় প্রাণীদের আবাসস্থল আজ চরম সংকটে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের তদারকি ও সদিচ্ছার অভাবে বনের ভেতরের অপরাধ, মাছে বিষ প্রয়োগ এবং বন্যপ্রাণী নিধন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশের বনের বর্তমান অবস্থা, বিশেষ করে সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্র কেমন?
বাংলাদেশের বনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে সুন্দরবন। যদিও সেখানেও মাছ শিকারের প্রবণতা এবং নানা চাপে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, তবু দেশের অন্য বনের তুলনায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এখনো অনেকাংশে টিকে আছে। বিশেষ করে ‘ফিনফুট’ বা প্যারাবনের হাঁসের মতো দুর্লভ পাখির বড় একটি অংশ সুন্দরবনের স্বাদুপানির পূর্ব অঞ্চলে বাস করে।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনের অবস্থা অত্যন্ত জঘন্য। সেখানে কোনো ভার্জিন ফরেস্ট বা অক্ষত প্রাকৃতিক বন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। জুম চাষ, নির্বিচারে গাছ কাটা, ইলেকট্রিক কারাত দিয়ে ৬০-৮০ ফুট উঁচু গর্জন গাছ মুহূর্তে ধ্বংস করা এবং রাজনৈতিক ও জনমিতির ভারসাম্য রক্ষার নামে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন— সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। কাপ্তাই বাঁধের কারণেও বিশাল এলাকার জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণে আপনার পরামর্শ কী?
বাংলাদেশ সরকার বনের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, তার অন্তত ৫০ শতাংশ অর্থ সরাসরি সুন্দরবন সুরক্ষার কাজে ব্যয় করা উচিত। কারণ, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে দেশের অন্যান্য বনাঞ্চল হয় ব্যক্তিমালিকানাধীন হয়ে যাবে কিংবা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাণিজ্যিক বাগানে পরিণত হবে, যেগুলোকে আর প্রকৃত প্রাকৃতিক বন বলা যাবে না। একমাত্র সুন্দরবন এখনো আমাদের শেষ ভরসা।
(২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, মিরপুর, ঢাকা)





