মেট্রোরেলে নজীবুর রহমানের মৃত্যু, প্রশ্নের মুখে যাত্রীদের ‘কমনসেন্স’

গণপরিবহনে সহানুভূতি পারস্পরিক দায়িত্ববোধের অংশ। ছবি: আগামীর সময়
চার দিন আগে ঢাকার মেট্রোরেলে অসুস্থতা বোধ করে পড়ে গিয়ে মারা যান ৬৪ বছর বয়সী ড. নজীবুর রহমান। তার সন্তানের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে সহযাত্রীদের কাছে বসার জায়গা চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সে সময় কেউ এগিয়ে আসেনি। এই অভিযোগ নতুন করে সামনে এনেছে গণপরিবহনে যাত্রীদের পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি। কেউ কেউ বলছেন, শুধু গণপরিবহন নয়, অনেক ক্ষেত্রেই সহানূভূতি বা কাণ্ডজ্ঞানের সংকট দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন ড. নজীবুর। বসার জায়গা চাওয়ার এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি।
তার বড় ছেলে নাকিবুর রহমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য। পাশাপাশি কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। আজ বুধবার আগামীর সময়ের কাছে অনেকটা আক্ষেপই প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘আমি বলছি না বাবাকে বসতে দিলে তিনি মারা যেতেন না। তবুও কেউ যদি আমার বাবাকে বসার সুযোগ দিতেন, তিনি একটু হলেও স্বস্তি পেতেন। হয়তো এভাবে নিচে পড়ে যেতেন না।’
কী ঘটেছিল
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন ড. নজীবুর। অনুষ্ঠান শেষে বিকাল তিনটার দিকে যান শাহবাগ মেট্রোস্টেশনে। গন্তব্য ছিল উত্তরা। তার সঙ্গে ছিলেন একজন সহকর্মী, যিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।
নাকিবুর রহমানের ভাষ্য, মেট্রোরেলে বরাবরই ভিড় থাকে। বসার আসন না পেয়ে দুজনই হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলিতে তারা একে অপরের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ট্রেনটি শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছায়। এ সময় তার বাবা অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। আশপাশের যাত্রীদের কাছে কয়েকবার বসার জায়গা চান তিনি। কিন্তু কেউ তাকে বসতে দেয়নি।
একটু পর মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে গেলে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তাকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। তাদের অনেকেই বলতে থাকেন, কিছুক্ষণ আগেও তিনি বসার জায়গা চেয়েছিলেন, আপনারা কেউ বসতে দিলেন না। হৈচৈ শুনে ড. নজীবুবের সহকর্মী হাজির হন সেখানে। দ্রুতই টের পান পরিস্থিতি। পরে বুঝতে পারেন, তার সহকর্মী আর বেঁচে নেই।
‘ফোন লকড থাকায় খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি’
ড. নজীবুরের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস ছিল। তার সন্তান বললেন, ‘উত্তরা উত্তর স্টেশনে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়েছিল। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে বাবাকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাবার ফোন লকড থাকায় সেটি থেকে আমাদের খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন নাকিবুর। বিকাল পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা জানান তার বাবা আর নেই।
ড. নজীবুরের স্ত্রী ও ছোট ছেলে তখন সৌদি আরবে। ওমরাহ পালন করতে গিয়েছিলেন তারা। বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতা আটকে দেয় তাদের। অপর দুই সন্তান থাকেন নিউজিল্যান্ডে। তাদের ছাড়াই গৌরনদী উপজেলায় ড. নজীবুরের দাফন হয়। এর আগে বাদ এশা উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের আইইএস মসজিদ প্রাঙ্গণে হয় নামাজে জানাজা।
সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান
কাউকে দোষারোপ না করলেও গণপরিবহনে প্রবীণ, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের প্রতি সবার সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত বলে মনে করেন নাকিবুর।
আগামীর সময়কে তিনি বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে দোষারোপ করছি না। সেখানে যাত্রীরা তাকে ধরে তোলার চেষ্টা করেছেন। আনসার সদস্যরাও সহযোগিতা করেছেন।’ যদিও শুরু থেকেই এমন সহযোগিতা পেলে ঘটনাটি ভিন্ন হতে পারত, এমনটাই মনে করেন তিনি।
‘মেট্রো সবার। শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রবীণরা চলাচল করেন। সবসময় আসন ছেড়ে দিতে হবে, এমন নয়। তবে তাদের প্রতি খেয়াল রাখা, অসুস্থ বোধ করলে সহযোগিতা করা, ঘেমে গেলে মুছে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো আমাদের মেনে চলা উচিত।’
অগ্রাধিকার আসনে বসে থাকেন তরুণেরাও
এ ঘটনার পর মেট্রোরেলের অগ্রাধিকার আসনের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবে এসব আসন কতটা নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দেখতে আজ বুধবার দুপুরে সরেজমিন কয়েকটি স্টেশনে যাত্রীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এমআরটি-৬ লাইনের মেট্রোরেল উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল করে। কয়েকজন যাত্রী জানালেন, অনেকে উত্তরা যাওয়ার উদ্দেশে সচিবালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন থেকে মতিঝিলগামী ট্রেনে ওঠেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে মতিঝিল স্টেশনে অধিকাংশ যাত্রী নেমে গেলে আসন খালি হবে। তখন বসে উত্তরা পর্যন্ত যাওয়া যাবে।
মতিঝিল থেকে উত্তরা অভিমুখে মেট্রোরেল চলতে শুরু করলে প্রতিটি স্টেশনেই যাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
এদিকে, প্রতিটি বগিতে অগ্রাধিকার আসনের ওপর লেখা রয়েছে, ‘অনুগ্রহপূর্বক প্রবীণ নাগরিক, গর্ভবতী নারী, শিশুসহ অভিভাবক এবং শারীরিক/মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আসন ছেড়ে দিন।’
তবে এসব আসনে প্রবীণদের পাশাপাশি বসেছিলেন তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষরাও। কোনো স্টেশনে প্রবীণ যাত্রী উঠলে তাদের কেউ কেউ আসন ছেড়ে দেন, আবার কাউকে বসে থাকতে দেখা যায়।
শাহবাগ স্টেশনে এক প্রবীণ যাত্রীকে দেখে নিজের আসন ছেড়ে দেন শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান। আগামীর সময়কে তিনি বলেন, ‘মেট্রোতে আমাদের যেতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। এই সময় দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু প্রবীণদের দাঁড়িয়ে যেতে কষ্ট হয়। এমনিতেই ঠেলাঠেলিতে তারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।’
ফার্মগেট থেকে মতিঝিল স্টেশনে নামার সময় কথা হয় ৬৮ বছর বয়সী শাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বললেন, ‘অনেক সময় মেট্রোরেলে উঠলে কম বয়সী ছেলেরা আসন ছেড়ে দেন। তবে অনেক সময় দাঁড়িয়েও চলাচল করতে হয়।’
তার মতে, গণপরিবহনে কাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে, তা পরিবার থেকেই শিশুদের শেখানো উচিত।
নেই প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা
মেট্রোরেলে এক দিনও খালি আসন পাননি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি বললেন, ‘অনেক সময় কম বয়সী তরুণদের আসনে বসে থাকতে দেখা যায়, যা বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে।’
‘আমাদের গণপরিবহনে শিশু ও প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা নেই। মেট্রোরেলের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। তাই স্টেশনগুলোতে প্রবীণ, গর্ভবতী নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আসন ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’
এ ছাড়া স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে প্রচার চালানোর পরামর্শ দেন তিনি। গুরুত্ব দেন প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখার ওপরও।
আগামীর সময়কে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি স্টেশনে নির্ধারিত একটি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে পারেন।’
অন্যদিকে, অগ্রাধিকার আসনে নির্দেশনা লিখে রাখার পাশাপাশি তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন গণমাধ্যমকর্মী নাজমুস সাকিব রহমান।
তিনি বলেন, ‘ড. নজীবুরের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের কাণ্ডজ্ঞান বা কমনসেন্সের সংকট সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা অনেক সময় নিয়মকানুন জানি, কিন্তু কখন কোথায় মানবিক আচরণ করতে হবে, সেই বোধটুকু হারিয়ে ফেলি।’
‘গণপরিবহনে সহানুভূতি পারস্পরিক দায়িত্ববোধের অংশ। আজ একজন অন্যের সহযোগিতা চাইছেন, কাল সেই পরিস্থিতিতে আমরাও পড়তে পারি। তাই পরিস্থিতি বুঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাশে দাঁড়ানো সবচেয়ে জরুরি’, যোগ করেন তিনি।







