সোয়া লাখ গাছ লাগিয়েছেন রাজ্জাক

সড়কের পাশে রাজ্জাকের লাগানো গাছ
সারি সারি গাছ। ফলদ, বনজ কিংবা ঔষধি। এসব গাছে মৌসুমে ফুল-ফল ধরে। ফল পাকলে কারও অনুমতি ছাড়াই যে যার মতো পেড়ে খেতে পারেন। আবার সেই ফুল-ফলের লোভে গাছে ভিড় করে নানা জাতের পাখি।
এসব গাছ লাগানো হয়েছে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে। নিজের পকেটের টাকায় ছাত্রাবস্থা থেকে গাছগুলো রোপণ করেছেন উপজেলার সিন্দুর্না গ্রামের মিজানুর রহমান রাজ্জাক (৪৪)। প্রায় দুই দশক আগে তার লাগানো গাছগুলো এখন পরিণত। তিনি শুধু নিজের উপজেলাতেই নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলাসহ পাশের জেলা নীলফামারীতেও গাছ লাগিয়েছেন। প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি নিখাদ এই ভালোবাসার কারণে তিনি এলাকাবাসীর কাছে ‘গাছপাগল রাজ্জাক’ নামে পরিচিত।
২০০৬ সালে বিভিন্ন সড়কের পাশে গাছের চারা রোপণ শুরু করেন তিনি। নিজের হাতে যেমন গাছ লাগান, তেমনি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের হাতেও রোপণের জন্য বিনামূল্যে তুলে দেন বিভিন্ন জাতের চারা। এভাবে গত দুই দশকে সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার চারা রোপণ করেছেন বলে দাবি রাজ্জাকের।
নিজের বাড়িতে সাত শতক জমিতে ‘সবুজ পৃথিবী বাঁচাও’ নামে একটি নার্সারি আছে তার। তিনি ২০০৬ সাল থেকে হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না, সিঙ্গিমারী, টংভাঙ্গা, পাটিকাপাড়া, ভেলাগুড়ি, গোতামারী ও গড্ডিমারী ইউনিয়নের সড়কের দুই পাশে চারা রোপণ করেছেন। এর বাইরে পাশের উপজেলা পাটগ্রামের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও কালীগঞ্জ উপজেলার দহগ্রামেও লাগিয়েছিলেন গাছ। এ ছাড়া নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চাপানি ইউনিয়নেও গাছ লাগিয়েছেন। এসব এলাকার বিভিন্ন রাস্তার পাশে, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চত্বর এবং হাট-বাজারে চারাগুলো রোপণ করেছেন রাজ্জাক।
স্নাতক পাস করে রাজ্জাক পেশা হিসেবে কৃষিকাজকেই বেছে নিয়েছেন। স্কুলশিক্ষক স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। তার এ কাজে সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন বাবা নুরুল হক।
রাজ্জাক জানিয়েছেন, কলেজে পড়ার সময়ই গাছ লাগানোর নেশায় পড়েন তিনি। কখনো টিউশনির টাকা জমিয়ে, কখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতনের টাকায় গাছের চারা কিনে রোপণ করেছেন। মাঝেমধ্যে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েও চারা কিনতেন। তার কাজ দেখে বিভিন্ন সময় স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষীরাও গাছের চারা দিয়ে তাকে সহায়তা করেছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, হাতীবান্ধার হাটখোলা থেকে তমের চৌপতি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য গাছ। রয়েছে আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজগাছ— যেগুলো এখন ফুল-ফল দিচ্ছে। এসব গাছ রাজ্জাকের লাগানো।
সিন্দুর্না ইউপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আরিফুল ইসলামের বাড়ি থেকে ধুবনী মোড় পর্যন্ত রয়েছে তার লাগানো সারি সারি গাছ।
রাজ্জাক বললেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে বেশি বেশি গাছ লাগানো দরকার। এটি যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব। সে দায়িত্ব থেকেই আমি এ কাজ করেছি। এখন আমার লাগানো চারাগুলো বড় বড় গাছ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সে গাছগুলো দেখে অনেক ভালো লাগে।’
পূর্ব সিন্দুর্না গ্রামের ব্যবসায়ী মোকছেদুর রহমান বললেন, ‘রাজ্জাক ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও রাস্তাঘাটে গাছ লাগান। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন হাজার হাজার গাছ। মানুষ যেখানে নির্বিচারে গাছ কাটে, সেখানে রাজ্জাকের বৃক্ষপ্রেম সত্যিই প্রশংসনীয়।’



