ডেঙ্গু
ফ্লাইটে উঠেই লিটন ফেসবুকে দেখতে পান তার মেয়ে মারা গেছে

ঐশী দাস
মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি শুনে প্রবাসে তার মন কেমন করছিল। কোনোভাবে কাজে মন বসাতে পারছিলেন না। সার্বক্ষণিক মেয়ের খোঁজ নিচ্ছিলেন। ঐশীর অবস্থা খারাপ, তা তাকে জানানো হয়নি। এরপর লিটন দাস সিদ্ধান্ত নেন দেশে ফেরার। বৃহস্পতিবার রাতে একটি ফ্লাইটের টিকিট নেন। তবে ফ্লাইটে বসেই তিনি ফেসবুকে কারও এক পোস্ট থেকে জানতে পারেন তার প্রাণের ঐশী আর নেই।
কুয়েত থেকে শুক্রবার সকালে কাট্টলীর বাড়িতে ফিরে লিটন দাস আদরের মেয়ে ঐশীর নিথর দেহ দেখতে পান। পরে শুক্রবার দুপুরে নিজের কাধে মেয়েকে শ্মশানে নিয়ে যান লিটন দাস। ঐশী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায়। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী এ নিয়ে চট্টগ্রামে সরকারিভাবে ডেঙ্গুতে মারা গেল ৩৫ জন। আর আক্রান্ত প্রায় ৭ হাজার।
আট বছরের ঐশী দাস কাট্টলী আইডিয়াল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। দুই বোনের মধ্যে ছোট সে। বড় বোন রুহি দাস সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। বাবা কুয়েতপ্রবাসী। মা লিপি দাস দুই মেয়েকে নিয়ে কাট্টলীতে থাকেন। মেয়ের জ্বর হওয়ার পর সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছিলেন লিটন।
এদিকে কয়েকদিনের জ্বরে ছোট বোন এভাবে চলে যাবে বিশ্বাসই হচ্ছে না রুহির। ‘আমার বোনের জ্বর হওয়ার পর বাবাকে জানানো হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর বাবার উদ্বেগ বাড়ে। আমরা বাবাকে ওর যে খারাপ অবস্থা তা জানাইনি। বাবা বৃহস্পতিবার দেশে আসার টিকিট কাটেন। প্লেনে বসে বাবা বোনের মৃত্যু সংবাদ ফেসবুকে দেখতে পান।’- বলতে বলতে কেঁদে ফেলল রুহি।
পরিবার জানিয়েছে, জ্বর হওয়ার পর বাসায় ছিল ঐশী। পরে মা ও শিশু হাসপাতালে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। সোমবার তাকে নগরীর রয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চলছিল চিকিৎসা। কিন্তু অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। বুধবার তার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। ঐশীর পাশে সার্বক্ষণিক ছিলেন মা লিপি দাস ও বোন রুহি।
মেয়েকে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে গেছে লিপির। ভাঙা কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আমার মেয়ে বুধবার পর্যন্ত কথা বলেছে। শেষ কথা সে বলেছে, মা আমার পেটে ব্যথা করছে বেশি। সিস্টারকে ডাকো। ওষুধ দিতে বলো। মা আমার বেশি ব্যথা করছে। এই শেষ কথা হয় আমার সঙ্গে মেয়ের।’
বুধবার রয়েল হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, ঐশীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিয়েও আইসিইউ পাওয়া যায়নি। পরে তাকে সাজিনাস হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঐশী মারা যায়।
জ্বর হওয়ার পর ঐশী কোনোভাবে হাসপাতালে যেতে চায়নি। সে চেয়েছিল বাসায় থাকতে। দুই বোনের মধ্যে অনেক ভাব। গেল দুর্গা পূজায় অনেক ঘুরেছে। অনেক আনন্দে কেটেছে তাদের সময়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এমন দিন দেখতে হলো তাদের। বোনের সঙ্গে কাটানো শেষ সময়গুলো এখন খুব ডাকে রুহিকে।
রুহি স্মৃতিচারণ করে, ‘আমার বোন বাসা থেকে হাসাপাতালে যেতে চায়নি। সে বলেছে দিদি আমি বাসায় থাকব। হাসপাতালে বুধবার আমার হাত ধরে বলেছিল, দিদি আমার খুব ঠান্ডা লাগছে। আমি বাসায় চলে যাব। আমি বলেছিলাম, তোকে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যাব। এরপর আর কথা বলেনি। আমার হাতটা ছেড়ে দেয়।’




