বিমানবাহিনীর সাবেক কর্তার মৃত্যু
দীপের দেওয়া তথ্যে নানা ‘অসংগতি’
- পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্য ক্রসচেক করছে পুলিশ
- তাহসিফের শরীরে অ্যালকোহলের সংশ্লিষ্টতা
- মামলা করার সিদ্ধান্ত পরিবার এখনো নেয়নি
- তাহসিফের বাসায় ফোন দেওয়ার সময় ও দীপের বাসার নিরাপত্তাকর্মীকে ফোন দেওয়ার সময় একই

ছবি: সংগৃহীত
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নানা অসংগতিমূলক তথ্য দিচ্ছেন তার পরিচিত ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। একেক সময় একেক কথা বলছেন তিনি। কখনও বলছেন আমাকে (দীপ) বাসার সামনে রেখে তাহসিফ বাসায় চলে গেছে, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের সঙ্গে আলাদা হয়ে যান। পরে আবার বলেছেন, টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এরপর বলেছেন, একদল লোকের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন তাহসিফ।
দীপের এসব বর্ণনায় বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। মিলছেনা আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর। কেননা- পুলিশের বা একদল লোকের ধাওয়া খেঁয়ে তাহসিফ যদি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে থাকেন, তাহলে সাঁতার জানার পরেও কেন তিনি তীরে উঠে এলেন না। দীপ কেন তাকে ফেলে বাসায় চলে আসলেন এবং পিবিআই হেফাজতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্য জানালেন না? এতো রাতে তারা কেন মাদকের হটস্পট হিসেবে খ্যাত টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন? মোটরসাইকেল উদ্ধার হলেও সেটি তাহসিফ নিজেই সেখানে নিয়েছেন কিনা? তাও ঘটনাস্থল থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে। দীপের দেওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা ক্রসচেক করছেন বলেও জানানো হয়।
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘দীপের দেওয়া সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সে বলছে, পুলিশের পোশাক পরা কেউ তাদের ধাওয়া দিয়েছিল। কারা ধাওয়া দিয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তারা মাদকাসক্ত ছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। অনেক কিছুই সে বলেছে, তবে সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরে নেওয়া হয়। পরে শুক্রবার দুপুরে তাহসিফের বন্ধু-স্থানীয় ছোটভাই দীপকে টঙ্গীর ওই ঘটনাস্থল এলাকা পরিদর্শনে যান পিবিআই কর্মকর্তারা। ঘটনার স্থানটি মাদক কেনাবেচার পরিচিত স্পট। সেখানে মাদক সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা।
তবে তাহসিফের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবার থেকে এখন কোনো মামলা বা অভিযোগ করবেন না বলে জানানো হয়। কিন্তু দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্ট হওয়া ও সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ায় পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত করছে পিবিআই, ডিবি, নৌ-পুলিশসহ নানা গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আগামীর সময়কে জানায়, তাহসিফের শরীরে অ্যালকোহল পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আরও বিস্তারিত জানা যাবে। সূত্র আরও বলেছেন, ঘটনার সময়কাল রাত দেড়টা থেকে আড়াইটার মধ্যে হবে।
এদিকে আজ শুক্রবার তাহসিফ সাউরির বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, তাহসিফ সাউরি সাঁতার জানতেন। শুধু তা-ই নয়, পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্সও করেছিলেন তিনি। ছিল সেই কোর্সের আছে সনদও। এতে করে দীপের দেওয়া নদীতে ঝাঁপের তথ্য মানতে নারাজ তিনি। উল্টো এনায়েতুল করিম দাবি করেছেন, কেন লোকজন তাহসিফকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দীপের বক্তব্যে অসংগতি
পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌ পুলিশের পাশাপাশি পিবিআইও ছায়া তদন্ত করছে। তদন্তের অংশ হিসেবে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটি শনাক্ত ও উদ্ধার করা হয়েছে।
দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা দুজন উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর একপর্যায়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। পরে তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেন দীপ। তাকে না পেয়ে একাই মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান বলে জানান তিনি। তবে দুজন একসঙ্গে সেখানে যাওয়ার পর কীভাবে আলাদা হলেন, তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে দীপ কেন একাই ফিরে গেলেন এবং ধাওয়ার ঘটনা ঘটলে সেটি তিনি আগে কেন জানাননি, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
একই সময়ে তাহসিফ ও দ্বীপের ফোন
নাম প্রকাশ না করা শর্তে দ্বীপের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জানায়, ঘটনার রাতে দ্বীপ রাত দেড়টার দিকে ফোন করে তাকে জানিয়েছিলেন, বাসায় ফিরতে কিছুটা দেরি হবে। পরে রাত আড়াইটার দিকে তিনি বাসায় প্রবেশ করেন। অথচ এর আগে গণমাধ্যমে দীপ দাবি করেছিলেন, রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তিনি তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন এবং এরপর বাসায় চলে যান। এই দুই বক্তব্যের সময়ের অসংগতি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফও মাকে ভয়েস মেসেজ দিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। তাহলে কি ওই সময় দুজন একই জায়গায় ছিলেন?
মামলার সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি
তাহসিফ সাউরির বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছে, মামলা করার বিষয়ে আমরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। পারিবারিকভাবে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। মামলা করা মানেই আমাদের দেশে আদালতে দৌঁড়াদৌঁড়ি, নানা ধরনের ঝামেলা। কে আর স্বেচ্ছায় এসব ঝামেলায় জড়াতে চায়? তিনি আরও বলেন, তাহসিফ যেহেতু বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তাই আমি আশা করি, সরকার তার মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর পেছনে দায়ীদের শনাক্ত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মামলার বিষয়ে নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, তাহসিফের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’—মাকে এ কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি জুলাই গণঅভুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা বিমানবাহিনীর সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। পরদিন বুধবার তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। এরপর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মরদেহ নিতে এসে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম বলেন, তার ছেলে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ না। তাহসিফকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে।





