পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বাতিঘর লিটন

লিটন গঞ্জু প্রতিষ্ঠিত দর্জি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নেন নারীরা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চা শ্রমিকের সন্তান লিটন গঞ্জু প্রতিকূলতাকে জয় করে সামাজিক সংগঠক হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। চা বাগানের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক মানুষের অনুপ্রেরণা।
উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখোলা চা বাগানের দরিদ্র চা শ্রমিক পরিবারে ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম লিটন গঞ্জুর। তিন ভাই ও দুই বোন এবং মা-বাবাকে নিয়ে পাত্রখোলা চা বাগানে বসবাস তার। তিনি ছোটবেলা থেকেই চা শ্রমিক ও সমাজের জন্য কিছু করতে উদগ্রীব ছিলেন। প্রতিদিন চা বাগানে আট ঘণ্টা কাজ করে তার মা ২৮ এবং বাবা ২৮ টাকা মজুরি পেতেন।
২০১৩ সালে সিলেটের একটি বেসরকারি সংস্থায় মাঠকর্মী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন লিটন। ২০১৬ সালে চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন নিজ জন্মভূমি পাত্রখোলা চা বাগানে। চা শ্রমিকের কাজে যোগ দেন তিনি।
চা বাগানে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি লিটন প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গঞ্জু সমাজসেবক ফোরাম’। মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জে এই সংগঠনের শাখা ও কার্যক্রম রয়েছে। সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ও তার সহযোগী কয়েকজন চা শ্রমিকের সন্তান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
পিছিয়ে পড়া ও বেকার নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে পাত্রখোলা চা বাগানে অস্থায়ী দর্জি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন লিটন। এই কেন্দ্রে বিনামূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন এমন দুজন নারী যমুনা রাজবংশী ও আলোমনি রিক্রিয়াশন। তারা জানালেন, লিটন গঞ্জুর মাধ্যমে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা এখন স্বাবলম্বী। কেন্দ্রের সাবেক প্রশিক্ষক রেহানা আক্তার ও মীনা নুনিয়া বলেছেন, ‘চা শ্রমিক নারীদের এগিয়ে নিতে খুব অল্প সম্মানী নিয়ে নারীদের স্বাবলম্বী হতে প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করেছি।’
লিটন এলাকায় শিক্ষার প্রসার, মানুষের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পাত্রখোলা চা বাগানে কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ নিয়ে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে বই আছে হাজারখানেক। বিভিন্ন ব্যক্তি বই দিয়ে তাকে সহায়তা করেন। আবার সামর্থ্য হলে পাঠকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিজেই বই কিনে আনেন।
বাল্যবিয়ে রোধ, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রসারে কাজ করছেন লিটন গঞ্জু। মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সংস্কৃতির প্রসারে মতবিনিময়, চা বাগানে উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে তিনি নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করেন।
লিটনের এসব কাজে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন মোহন রবিদাস, প্রদীপ, রিয়াজ আহমেদ, ইরাজ, সুদীপ্ত ভর, রাম সিংসহ অনেক চা শ্রমিকের সন্তান। লিটন জানালেন, বর্তমানে বেসরকারি সংস্থা আইএলও এবং আইপিডিএসের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে বেকার নারীদের স্বাবলম্বী করতে তাঁত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। লিটন ভবিষ্যতে এলাকায় একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক একাডেমি করার স্বপ্ন দেখছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বললেন, ‘সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে চা শ্রমিকরা অন্যতম। আর তাদের নিয়ে লিটন গঞ্জুর যে চিন্তাভাবনা, সেটি প্রশংসার দাবি রাখে। লিটনকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’



