কোয়ার্টারের মাঠও অনিরাপদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গাড়ির চাপায় প্রাণ যায় জায়েদের

শিশু জায়েদে। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
মিরপুর-১ নম্বর পাইকপাড়া নিউ সি টাইপ সরকারি কোয়ার্টার মাঠ। আজ শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার সময় খেলছিল জুতিসহ দুই শিশু। তারা যেখানে অবস্থান করছে তার সামনেই গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গাড়ির চাপায় মারা যায় তিন বছরের শিশু আব্দুল্লাহ আল জায়েদ। পাজেরো স্পোর্টস গাড়িটি তাকে চাপা দেয়।
কোয়ার্টারের যে আঙিনা একসময় শিশুদের খেলাধুলা আর হাসিতে মুখর থাকত, সেখানে এখন শোক। শিশু জায়েদের মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছে- আবাসিক কোয়ার্টারের ভেতরে খেলার জায়গাটুকুও কি শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়?
জানা গেছে, জায়েদকে চাপা দেওয়া গাড়িটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। গাড়ির চালক মন্টু খান এই কোয়ার্টারের ১৩৬ নম্বর ভবনের তিন তলায় থাকতেন। একই ভবনের নিচ তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটারের কর্মচারী শাহিন হোসেন।
মামলার এজহার সূত্রে জানা গেছে, গাড়িটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। গত বুধবার রাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাসায় খাবার খেতে আসেন ড্রাইভার। খাবার শেষে তাড়াহুড়ো করে ডিউটিতে যাওয়ার সময় ঘটে দুর্ঘটনা।
এ ঘটনায় গাড়িচালক মন্টু খানকে গ্রেপ্তার করেছে দারুস সালাম থানা পুলিশ। সড়ক আইনের মামলায় তাকে শনিবার আদালতে পাঠানো হয় বলেও জানানো হয়।
দারুস সালাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, গাড়িটি কার জন্য বরাদ্দ, কে ব্যবহার করছে এবিষয়ে তদন্ত চলমান। মন্টু শেখ ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন।
খেলার মাঠে এখনো খুঁজে ফেরে জায়েদকে
শনিবার সরেজমিনে ওই কোয়ার্টারের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, শিশুরা আগের মতোই খেলাধুলা করছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে নেই আরেকটি পরিচিত মুখ। সেখানে থাকা শিশু জুতি জানায়, ‘আমরা যেখানে খেলছি, জায়েদও এখানে খেলত। সাদা রঙের একটা গাড়ি জায়েদের গায়ের ওপর উঠে যায়। আমরা একসঙ্গেই খেলতাম। কিন্তু আজ জায়েদ নাই।’
শিশুটির এই সরল কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা। মাঠটি আছে, খেলনাগুলো আছে, আছে খেলার সাথিরাও— শুধু নেই জায়েদ।
বাসার সামনেই ছিল জায়েদের পৃথিবী
জায়েদের বাবা শাহীন হোসেন চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে থাকতেন পাইকপাড়া নিউ সি টাইপ কোয়ার্টারে। ১৩৬ নম্বর ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে তারা থাকেন। নিচতলায় বাসা হওয়ায় জায়েদের খেলার জগৎ ছিল ভবনের সামনের ছোট্ট জায়গাটুকু। সেখানেই কখনো বালু নিয়ে খেলত, কখনো ছুটে বেড়াত। বাবা-মায়ের চোখের সামনেই কাটত তার ছোট্ট শৈশব। ঘটনার দিনও ভবনের সামনে বালু নিয়ে খেলছিল জায়েদ। তার বাবা শাহীন হোসেন জানান, তিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে ছিলেন। এ সময় সাদা রঙের গাড়িটি ঘোরানোর সময় তার ছেলের ওপর উঠে যায়।
একটি গাড়ি ঘোরানোর মুহূর্তেই যেন থেমে যায় একটি পরিবারের সব স্বপ্ন। যে সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়ের ছিল অসংখ্য পরিকল্পনা, যে শিশুর মুখে হাসি দেখতে প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন তারা, সেই সন্তানকেই হারাতে হলো চোখের সামনে।
কোয়ার্টারের ভেতরেও নিরাপত্তার অভাব
কোয়ার্টারের বাসিন্দা শাহোর বলেন, ‘জায়েদ অনেক ছোট শিশু, মাত্র তিন বছর বয়স। কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত নয়, সেই জ্ঞান-বুদ্ধি তার ছিল না। যিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তার তো বোঝা উচিত ছিল এটি একটি আবাসিক এলাকা। এখানে শিশুরা খেলবে, গাড়ির পেছনেও শিশু থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘কোয়ার্টারের ভেতরে গাড়ি প্রবেশই নিষিদ্ধ। সেখানে কোনো ধরনের সতর্কতা না নিয়ে এভাবে গাড়ি চালিয়ে একটি শিশুকে চাপা দেওয়া হলো।’
বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবাসিক এলাকার ভেতরে শিশুদের চলাচল ও খেলাধুলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। অথচ সেই নিরাপত্তার জায়গাতেই ঘটেছে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
গাড়িটি কার, চালক কীভাবে ঘটালেন দুর্ঘটনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাড়িচালক মন্টু খান বুধবার রাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পর বৃহস্পতিবার দুপুরে খাবার খেতে কোয়ার্টারে আসেন। খাওয়াদাওয়া শেষে আবার গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, গাড়ি ঘোরানোর সময় চালক মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। আবার কারও কারও দাবি, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে তার চোখে ঘুম ছিল। তবে এ বিষয়ে পাইকপাড়া নিউ সি টাইপ কোয়ার্টার আবাসিক কল্যাণ সমিতির কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিক বাসিন্দার কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা বিষয়টি জানেন না বলে এড়িয়ে যান।
সরেজমিনে দেখা যায়, একই ভবনের তৃতীয় তলায় থাকতেন গাড়িচালক মন্টু খানসহ পরিবারের সদস্যরা। ঘটনার পর ভবনটির পরিবেশ ছিল বেশ নীরব। নিচতলার দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের দুটি ফ্ল্যাট তালাবদ্ধ দেখা যায়। তৃতীয় তলায় মন্টুর পরিবারের ফ্ল্যাটের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি বোঝা গেলেও ডাকাডাকি করার পর কেউ দরজা খোলেননি। একই ভবনের একতলা থেকে তিনতলা— একদিকে একটি শিশুর মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে অভিযুক্ত চালকের পরিবারকে ঘিরে নীরবতা। ভবন জুড়েই যেন ছড়িয়ে আছে অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি।
মাত্র তিন বছরের একটি শিশু। যার পৃথিবী বলতে ছিল বাবা-মা, নিজের বাসা আর কয়েকজন খেলার সঙ্গী। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, নতুন নতুন শব্দ শেখার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে বড় হওয়ার কথা, সেই বয়সেই থেমে গেল তার জীবন।
জায়েদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি আবাসিক এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে। যে জায়গাকে অভিভাবকরা নিরাপদ আশ্রয় মনে করেন, যে বাসার সামনের আঙিনায় নিশ্চিন্তে সন্তানকে খেলতে দেন, সেই জায়গাতেও যদি শিশুর জীবন ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে নিরাপদ শৈশবের নিশ্চয়তা কোথায়?





