আমার হৃদয়ে বাঁচো
আড়ালের মিনার মাহমুদ

ছবি: কোলাজ
তখনও চিত্রশিল্পী সৈয়দ ইকবালের কাছ থেকে প্রথম গল্পের বইয়ের প্রচ্ছদ আদায় করতে পারেননি মিনার মাহমুদ। তার মনে অস্থিরতার পারদ ক্রমশ উর্দ্ধমুখী হচ্ছে। তখন সম্ভবত ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাস ফুরিয়ে আসছে। শান্তিনগরে মানিক চৌধুরীর ঘুপচি লেটার প্রেসের অফিস ঘরে এক বিকেলে বসে গল্পগুলোর প্রুফ কপি আমার পড়া শেষ। গল্পগ্রন্থের নাম ঠিক করা হয়েছে ‘মনে পড়ে রুবি রায়’; ষাটের দশকে রাহুল দেব বর্মণের সুর করা এবং গাওয়া বিখ্যাত গানের অনুসরণে। তখন সেনা সমর্থিত স্বৈরাচারী সরকার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। সরকার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জ্বরে পুড়ছে স্বদেশ। আমরা বিবর্ণ হয়ে আসা জিন্স প্যান্ট আর স্নিকার্স পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রাম্পাসে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াই আর রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর নিজেদের অনাস্থা প্রকাশ করি নানা পন্থায়। মিনার মাহমুদ তখন প্রখ্যাত সাপ্তাহিক বিচিত্রার সাংবাদিক। ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানব’ আর ঢাকা ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস’ নামে প্রচ্ছদ কাহিনী লিখে মহা আলোচিত।
মোট সাতটি গল্প নির্বাচিত হয়েছিল বইতে জায়গা করে নেয়ার জন্য। লিখতে বসে মনে পড়ছে ‘স্বপ্নের সমুদ্র যাত্রা’, ‘মনে পড়ে রুবি রায়’, ‘ক্যাম্পাসের দিনরাত্রি’, ‘নেই’ গল্পগুলোর কথা। মফস্বল শহরের নতমুখ জীবন, সর্বহারা রাজনীতির বৈপ্লবিক বিস্তার, আশির দশকে ঢাকায় ডালপালা ছড়াতে শুরু করা নব্য বুর্জোয়া জীবনধারার চাপ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপে ছিন্নভিন্ন স্বপ্নের তরুণ শরীর আর ব্যক্তিগত শূন্যতাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গদ্যভাষায় বেঁধে মিনার মাহমুদ একটি বিক্ষুব্ধ হাতবোমার মতো নিক্ষেপ করেছিলেন পাঠকের সামনে। বোমাটিও বিস্ফোরিত হয়েছিল সশব্দে। আলোচনা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের লেখালেখির জগতে। মিনার মাহমুদের আলাদা গদ্যভঙ্গী পাঠককে রীতিমত চমকে দিয়েছিল। গল্পের সংকলনটি প্রকাশ পায় ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, বইমেলা চলার সময়। শেষ পর্যন্ত রঙচঙে প্রচ্ছদটি এঁকে দিয়েছিলেন সৈয়দ ইকবাল। তারপর প্রেস, প্রুফ দেখা,বই হাতে পাওয়া ইত্যকার ঘটনার পর মিনার মাহমুদের ভাষায় ‘লট অফ ঘ্যান্তাকারি’ টপকে বইটি মেলায় প্রকাশিত হয়। মাত্র আঠারো টাকা মূল্যে গল্প সংকলনটির বিক্রিও মন্দ ছিল না। তবে বিক্রি থেকে যে পরিমাণ অর্থের আগমন হয়েছিল তার প্রায় পুরোটাই স্পিরিট হয়ে উড়ে যায় নবাবগঞ্জের সুইপার কলোনির ঝুপরি ঘর আর সাকুরায়। বইটির ভূমিকায় মিনার মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘‘সত্যি বলতে কি, বুড়ো কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যেরকম নিষ্ঠার সঙ্গে বেয়াদবি করেছি লেখার ব্যাপারে এর অর্ধেকও সিরিয়াস ছিলাম না। তবে আমার ধারণা লেগে থাকলে হয়ত কিছু একটা হতো অবশেষে। কিন্তু কিছুই হলো না’’।
ওই সময়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রা ছেড়ে নিজেই একটি সাপ্তাহিক কাগজ করার নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলেন মিনার মাহমুদ। ওই সময়টাতে তার সঙ্গে ডাক টিকেটের মতো সেঁটে থাকলেও নতুন সাপ্তাহিক ‘বিচিন্তা’র অভিযানের সঙ্গে জড়িত হইনি। যতদূর মনে পড়ে, বিচিন্তা প্রকাশিত হওয়ার আগে মিনার মাহমুদ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন—‘‘আমরা কুমড়ার রেসিপি আর পাঞ্জাবির ফ্যাশন বদলের খবর ছাপি না’’। আমি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় তখনও কাজ করি বলে তার এক ধরণের শত্রুপক্ষ। কিন্তু আমাদের রোজ সন্ধ্যাবেলা দেখা হতো ইস্কাটনে আলোকচিত্রী আক্কাস মাহমুদের ছবি তুলে অমর হওয়ার স্টুডিও ‘পদ্মা‘য়। তখন বিচিন্তা প্রকাশিত হয়ে পাঠকের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে ফেলে। একদল তরুণ সাংবাদিক তার সম্পাদনায় বিচিন্তার হাত ধরে পেশাগত জীবন শুরু করে। তারা অনেকেই এখন দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক। সাপ্তাহিক বিচিন্তার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ। জেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন মিনার মাহমুদ।
সাংবাদিক মিনার মাহমুদের আরেকটি ভীষণ নেশা ছিল বিচিত্র ধরণের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা। তার সূত্রে খুনী থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী, ছাত্রনেতা, ব্যবসায়ী, কবি, গল্পকার, হাত দেখিয়ে, নেশাসক্ত, সঙ্গীতশিল্পী—বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে আমারও সখ্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কথা বলে মানুষকে সম্মোহিত করার একটা অদ্ভুত গুন ছিল তার মধ্যে। নিজের লেখা গল্পের গদ্য ভাষার মতো এক ধরণের দখল করে নেয়ার প্রবণতা নিয়ে কথা বলতেন মিনার মাহমুদ। দেখেছি প্রতিপক্ষ খুব সহজেই তার কথায় বশ্যতা স্বীকার করে নিত। তার গল্পের ভাষার সঙ্গে বাস্তবে ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক অনন্য কৌশল তার করায়ত্ত ছিল।
আসলে মিনার মাহমুদের ছিল বেপরোয়া জুয়াড়ি চরিত্র। যে কোনো বিষয়ে আচমকাই যে কোনো বিষয় নিয়ে বাজি ধরতে পারতেন। সেই বাজি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অনায়াশে জড়িয়ে যেতেন অনিশ্চিত খেলায়। আশির দশকের মাঝামাঝি ভয়ানক ছত্রভঙ্গ এক সময় কাটিয়েছি আমরা দুজন। আশির দশকের মাঝামাঝি এক দুপুরে আমাদের পকেটে খুব সামান্য কিছু অর্থ মুমূর্ষু অবস্থায় নিঃশ্বাস ফেলছে। ওই অর্থে কোনো রেস্তোরাঁ দুপুরে আমাদের খাবার সরবরাহ করবে না। কী করা যায়? কাকরাইল মোড়ে পৌঁছাতেই সেই দুপুরবেলা আচমকা রিকশা থামিয়ে আমাকে নিয়ে নেমে গেলেন। ওই দিন রিকশা ভাড়ার টাকাও পকেটে ছিল না দুজনের। আমরা ঢুকে পড়েছিলাম তখনকার সাপ্তাহিক মেঘনা পত্রিকার কার্যালয়ে। সিঁড়ি টপকে সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন মিনার মাহমুদ। আমার মনে তখনও বিষ্ময়ের ঘোর; লোকটা কী ঘটাতে চলেছে? বাংলাদেশে তখন রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে শক্তিশালী এক পীরের অতিমাত্রায় ভক্ত সেই সম্পাদকের সামনে পীর সম্পর্কে সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি গল্প ফেদে বসেন মিনার মাহমুদ। শ্রোতা-দর্শক হিসেবে মাথা নাড়া ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না। সম্পাদক কাহিনি শুনে মুগ্ধ হয়ে ঘটনাটা লিখে দিতে বললে মিনার মাহমুদ রাজি হয়ে যান এবং আগাম একশ টাকা আদায় করে নেন। সেই অর্থে আমাদের কপালে ঢাকা স্টেডিয়াম এলাকার একটি প্রখ্যাত রেস্তোরাঁয় সেদিন দুপুরে চমৎকার খাবার জুটেছিল। সেদিন বেপরোয়া গল্পটি তার মাথায় না এলে বিপদেই পড়ে যেতাম।
নব্বইয়ের দশকে গণ আন্দোলনের পর দুম করে বিয়ে করেছিলেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী, কবি তসলিমা নাসরিনকে। খবরটা তখনও আমার অজানা। মাত্র এগারো মাসের একটা ঝোড়ো ইনিংস ছিল তাদের বিয়েটা। সেই সময়ে কোনো এক গভীর রাতে ল্যান্ডফোনে কল করে ঘুম থেকে তুলে বরাবরের মতো সপ্রতিভ গলায় প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বল তো আমি এখন কী করছি?
একটু থতমত খেয়ে ঘুম জড়ানো গলায় জানি না বলতেই বলেছিলেন, ‘একজন নারী আমার নখ কেটে দিচ্ছেন এই মুহূর্তে। তার নাম তসলিমা নাসরিন; তাকে অভিনন্দন জানাও।’
ঢাকা শহরে অসংখ্য আড্ডা আর অদ্ভুত সব ঘটনাপ্রবাহের ভিতর দিয়ে আমরা দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছি। সেই সময়ের ঘূর্ণাবর্তে এক গল্পকার হারিয়ে গিয়ে জন্ম হয়েছিল সাংবাদিক মিনার মাহমুদের, যিনি জেদি, ঝুঁকিপ্রবণ এবং ইমোশনাল। একইসঙ্গে দীর্ঘ সময়ের জন্য দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। খ্যাতির শিখর থেকে নেমে হারিয়ে গিয়েছিলেন মার্কিন মুলুকে অচেনা মানুষের ভিড়ে। কিন্তু সম্ভবত মনের ভিতরে বয়ে চলা অদ্ভুত এক চেতনা প্রবাহ তাকে আঠারো বছর পর ফিরিয়ে এনেছিল স্বদেশে। হয়ত নিজস্ব মৃত্যুর পরিণতি তাকে টেনে নিয়ে এসেছিল চেনা শহরটায়। ঢাকা শহরের জীবন তাকে আর মানায়নি। আচমকা এক সকালে এয়ারপোর্টের অদূরে এক হোটেল কক্ষে আত্মহত্যা করেন মিনার মাহমুদ। ২০১২ সালের ২৯ মার্চ শহরটা যখন গরমে ছটফট করছিল তখন জীবনকে বিদায় বললেন তিনি।



