আইন সংশোধনে ‘একচ্ছত্র ক্ষমতা’ নিতে চায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড
- প্রস্তাবিত সংশোধনীর ৪ ধারা বাতিল চায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন

সংগৃহীত ছবি
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর চারটি ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির আশঙ্কা, ধারাগুলো কার্যকর হলে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) জনবল, চাকরিবিধি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা এককভাবে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
গত ২৯ অক্টোবর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) প্রস্তাবিত ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইন, ২০১৩’ সংশোধনীর বিষয়ে আপত্তি জানায়। চিঠিতে ধারা ৬(ঠ), ২৪(১), ২৮ ও ২৯-এর সংশোধনী বাতিলের দাবি করা হয়েছে।
দেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি সাড়ে ৫ লাখ। যার মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ গ্রাহক রয়েছে। সংস্থাটি ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ বিতরণ করছে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে সমিতিগুলোর। এ নিয়ে আন্দোলনে নেমে অনেকেই চাকরি খুইয়েছেন। মিথ্যা মামলা ও নানা রকম হয়রানিরও শিকার হয়েছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, ধারা ৬(ঠ) কার্যকর হলে সমিতিগুলোর ব্যবস্থাপনা, জনবল, বেতন কাঠামো, চাকরিবিধি ও প্রশাসনিক পরিচালনায় বোর্ডের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। ধারা ২৪(১)-এ জনবল কাঠামো ও চাকরি পরিচালনার যাবতীয় ব্যবস্থা বোর্ডের অধীনে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ধারা ২৮ ও ২৯-এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিবিধি ও প্রবিধান প্রণয়নে বোর্ডের একতরফা ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে বলে তারা আপত্তি জানিয়েছে।
সংগঠনটির আশঙ্কা, নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, বেতন-ভাতা ও চাকরির শর্ত নির্ধারণে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে সমিতিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা ও প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরির অনিশ্চয়তা, পদ-পদবি ও বেতন কাঠামো নিয়ে বৈষম্য এবং অসন্তোষ বাড়তে পারে। এতে পল্লী বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্ট করেছে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নাম পাল্টে ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ করার প্রস্তাবে তাদের আপত্তি নেই। বিদ্যুৎ আইন ২০১৮ ও স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনগত ও প্রশাসনিক হালনাগাদকেও তারা ইতিবাচক মনে করছে। তাদের বক্তব্য, সংস্কার হতে হবে বৈষম্য দূর, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সুশাসনের জন্য; কোনো প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের মূল অধ্যাদেশ অনুযায়ী সমিতিগুলোর স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা ও পরিচালন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের এখতিয়ার, সরকারি কার্যবিধি এবং আগের সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গেও প্রস্তাবিত সংশোধনীর কয়েকটি বিষয় সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিশেষভাবে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ডিসি সম্মেলনের সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে, যেখানে আরইবি ও পবিসের জন্য এক ও অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়নের মাধ্যমে একীভূতকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ ও পরবর্তী সরকারি নির্দেশনাতেও দুই পক্ষের বৈষম্য দূর করার কথা এসেছে।
অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বদলে সংশোধনীর মাধ্যমে সমিতিগুলোর ওপর আরও একতরফা নিয়ন্ত্রণ চাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন সংযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও জরুরি সেবার দায়িত্ব তারাই পালন করে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা না করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লে বিতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে।
সংগঠনটি বলছে, তারা আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিকায়নের বিরোধী নয়। তবে জনবল, চাকরিবিধি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা এককভাবে বোর্ডের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবকে তারা অযৌক্তিক এবং খাতের চলমান সংকট আরও জটিল করার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবিগুলো হলো: বিতর্কিত চারটি ধারা বাতিল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরইবি-পবিসের অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন, সমিতিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা সংরক্ষণ, চাকরিবিধি বা বেতন কাঠামো পরিবর্তনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের যথাযথ অনুমোদন নিশ্চিত করা।
অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের মতে, খাতে স্থায়ী শান্তি ও গতিশীলতা আনতে কারও একক কর্তৃত্ব নয়, বরং অংশীজনদের মতামত, সরকারি সিদ্ধান্ত ও বাস্তবসম্মত সংস্কারের ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে। আইন চূড়ান্ত করার আগে সব পক্ষের মতামত নিতে এবং বিতর্কিত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।



