অসহায়দের ভাগ্য বদলাচ্ছেন জুয়েল

অসহায় নারীর হাতে বাছুর তুলে দিচ্ছেন জুয়েল
প্রতিবন্ধীর চলাচলে হুইলচেয়ার, অসহায় নারীর আয়ের জন্য সেলাই মেশিন, দরিদ্র পরিবারের জীবিকার জন্য ছাগল-হাঁস-মুরগি কিংবা ব্যাটারিচালিত ভ্যান। আবার তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য বাজারে গভীর নলকূপ স্থাপন। এভাবেই নিজের উপার্জনের অর্থে রাজশাহীর চারঘাটে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান জুয়েল। নিজের ব্যবসার আয়ে ২০১৬ সাল থেকে এসব কাজ করছেন তিনি। তার উদ্দেশ্য, শুধু সাময়িক সহায়তা নয়; বরং দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
চারঘাট উপজেলা বাজারের সিএনজি স্ট্যান্ডে স্থাপন করা গভীর নলকূপটি তার মানবিক উদ্যোগের একটি উদাহরণ। প্রতিদিন এ বাজারে শত শত মানুষের যাতায়াত। চালক, দোকানদার, পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন এখানে। কিন্তু বিশুদ্ধ পানির সহজ ব্যবস্থা ছিল না। এক গ্লাস পানির জন্য অনেককে দূরে যেতে হতো। বিষয়টি নজরে আসার পর সেখানে একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করেন জুয়েল। এখন প্রতিদিন বহু মানুষ সেখান থেকে পানি পান করছেন।
অটোরিকশাচালক রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘আগে সারা দিন গাড়ি চালিয়ে পানির জন্য কষ্ট হতো। এখন জুয়েল ভাইয়ের টিউবওয়েল হয়েছে। যখন-তখন পানি খেতে পারি। আল্লাহ তাকে ভালো রাখুন।’ বাজারের মুদিদোকানি আবদুল মান্নান বললেন, ‘এটি ছোট কাজ মনে হলেও আমাদের জন্য অনেক বড় উপকার। পথচারীদের তৃষ্ণা মেটানোর মতো মহৎ কাজ আর হয় না।’
স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে জুয়েল (৪৫) থাকেন চারঘাট পৌরসভার আস্করপুর এলাকায়।
জুয়েল জানালেন, ১০ বছরে তিনি প্রতিবন্ধী ও চলাচলে অক্ষম মানুষের মধ্যে ১০টি হুইলচেয়ার, ২১টি হাঁটার লাঠি ও ক্র্যাচ বিতরণ করেছেন। অসহায় নারী-পুরুষকে স্বাবলম্বী করতে দিয়েছেন ৫০টি ছাগল, ১ হাজার হাঁস-মুরগি, ৩টি গরু, ১০টি ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও রিকশা এবং ১৬টি সেলাই মেশিন; গৃহহীন পরিবারের জন্য দিয়েছেন ঘর তৈরির ১০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ৫০০টি সিমেন্টের খুঁটি ও ১৩৭টি নলকূপ।
এ ছাড়া চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারা মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেন তিনি। জরুরি প্রয়োজনে রক্তের ব্যবস্থাও করেন। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেন বই, খাতা ও শিক্ষা উপকরণ। অন্যদিকে, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ক্লাবে বিতরণ করেন জার্সি, ফুটবলসহ খেলার সামগ্রী।
জুয়েলের দেওয়া একটি সেলাই মেশিন বদলে দিয়েছে মেরামতপুর মহল্লার বিধবা জাহানারা বেগমের জীবন। সেই মেশিনে কাজ করে এখন আয় করছেন তিনি। জাহানারা বললেন, ‘জুয়েল আমাকে একটি সেলাই মেশিন দিয়েছিলেন। সেই মেশিনে কাজ করে এখন আয় করছি। এখন আর অন্যের কাছে হাত পাততে হয় না।’
জুয়েল বলছিলেন, ‘আমি ব্যবসা করি। আল্লাহ আমাকে যতটুকু সামর্থ্য দিয়েছেন, সেখান থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। চারঘাট এলাকা একটু ব্যতিক্রম। চারপাশে নদী থাকায় এখানে কাজের সুযোগ কম। অনেক মানুষ কষ্টে আছেন। আমরা যারা একটু ভালো আছি, সবাই মিলে এগিয়ে এলে এই কষ্ট অনেকটা কমানো সম্ভব।’
স্থানীয়রা মনে করেন, জুয়েলের মতো যুবকদের উদ্যোগ অন্যদেরও মানবিক কাজে উৎসাহিত করতে পারে।
নিজের ব্যবসার আয় থেকে মানুষের জন্য ব্যয় করা জুয়েলের কাছে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সামাজিক দায়িত্বও। কারও জন্য একটি হুইলচেয়ার মানে চলাচলের নতুন সুযোগ। কারও জন্য একটি সেলাই মেশিন মানে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ। আবার একটি নলকূপ মানে শত শত মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর ব্যবস্থা। ছোট ছোট এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই চারঘাটের মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন জুয়েল।




