ই-পাসপোর্টে প্রতারণা, ৯ টাকার ‘টোপে’ ফাঁকা ব্যাংক হিসাব
- আবেদনের পর আসছে ফিশিং লিংক, ক্লিক করলেই সর্বনাশ
- কোন পয়েন্ট থেকে তথ্য ফাঁস হচ্ছে সেটি শনাক্তের তাগিদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ই-পাসপোর্টের আবেদন করা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে প্রতারকদের হাতে। এরপর মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক (ফিশিং লিংক)। সেখানে ঢুকে ৯ টাকা ফি দিয়ে তথ্য সংশোধনের চেষ্টা করতেই আবেদনকারীর মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে সব টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কৌশলে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বেহাত হওয়াকে ‘বিপজ্জনক ঝুঁকি’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আর কারিগরি কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর।
পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দেওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আবেদনকারীর নাম, মোবাইল ফোন নম্বর ও আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা কীভাবে প্রতারক চক্রের হাতে পৌঁছাচ্ছে— তা নিয়ে ই-পাসপোর্টের সার্ভার ও ডেটা সুরক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে তার প্রমাণ মিলছে।
পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দেওয়ার পর কয়েকটি আইপি নম্বর (যেমন: ০৯৬১২-৩৪৩১৭৬, ০৯৬৪৮-৯০২৬২৯, ০৯৬৪৮-৯০২৬৪০) থেকে আবেদনকারীর কাছে এসএমএস আসে। ইংরেজিতে লেখা ওই বার্তায় বলা হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে নামের মিল না থাকায় পাসপোর্টের আবেদনটি আটকে আছে। নামের তথ্য সংশোধনের জন্য সেখানে একটি শর্ট লিংক (shorturl.at/...) যুক্ত করে দেওয়া হয়।
আবেদনকারী ওই লিংকে প্রবেশ করলে যে ওয়েবসাইটটি (pass.correction-center.sbs) সামনে আসে, তা দেখতে হুবহু পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মূল ওয়েবসাইটের (epassport.gov.bd) মতো। প্রতারকরা সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে মনোগ্রাম, রঙ, লে-আউট এমনকি নিচের দিকের ও কপিরাইট লেখাও নিখুঁতভাবে নকল করেছে। তবে মূল সরকারি ওয়েবসাইটের ঠিকানার শেষে ‘.gov.bd’ থাকলেও ভুয়া সাইটটির শেষে রয়েছে বেসরকারি ‘.sbs’ এক্সটেনশন। ওয়েবসাইটটিতে সরাসরি নাম সংশোধনের একটি পেজ খুলে রাখা হয়েছে।
ভুয়া ওই ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর প্রথমে আবেদনকারীর নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর চাওয়া হয়। নিচে একটি নির্দেশনায় বলা হয়, নাম সংশোধনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যাবে। তবে আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য মাত্র ৯ টাকা চার্জ কাটা হবে। টাকার অঙ্ক সামান্য হওয়ায় আবেদনকারীরা সহজেই প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। সেখানে বিকাশ বা অন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নম্বর ও পিন দেওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদনকারীর হিসাবের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় প্রতারকরা। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই হিসাব থেকে সব টাকা সরিয়ে নেয়।
গত ১৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা সুলতানা। তার কাছেও এমন একটি এসএমএস আসে। তিনি ওই লিংকে প্রবেশ করলে এনআইডি অনুযায়ী তার নাম ও নম্বর চাওয়া হয়। এরপর নাম সংশোধন করতে ৯ টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। তিনি বিকাশ নম্বর দেওয়ার পর ওটিপি ও পিন নম্বর দিলে তার হিসাবে থাকা সব টাকা কেটে নেওয়া হয়।
একই দিন ওই কার্যালয়ে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিয়ে একই রকম প্রতারণামূলক এসএমএস পান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। এর আগে গত ১৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে নিজের ও সন্তানের পাসপোর্টের আবেদন জমা দেন কলেজ শিক্ষক ফারজানা আক্তার। নিজের আবেদনে তিনি নিজের নম্বর এবং সন্তানের আবেদনে স্বামীর নম্বর ব্যবহার করেন। পরে দুজনের নম্বরেই এমন এসএমএস আসে। তবে স্বামীর সতর্কতার কারণে তিনি ওই লিংকে আর প্রবেশ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে ডিজিটাল অধিকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে প্রতারকদের হাতে চলে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উচিত এটি কোন পয়েন্ট থেকে ফাঁস হচ্ছে, সেটি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। জরুরিভিত্তিতে তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করে নাগরিকদের আশ্বস্ত করা।’
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. নূরুল হাফিজ বলেছেন, ‘কিছুদিন আগে আমাকে একজন জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি আর যোগাযোগ করেননি। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বিশেষ সতর্কতার একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। যাতে লোকজন এমন প্রতারক চক্রের ফাঁদে না পড়ে। তবুও টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে বসে বিষয়টি শনাক্ত করে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের সার্ভার থেকে এমন হওয়ার কথা না। কারণ এটি সুরক্ষিত।’



