বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
সাহিত্যে ‘সযত্ন ভালোবাসার প্রকৃতিবিজ্ঞান’

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ – ১ নভেম্বর, ১৯৫০)
গদ্যে প্রকৃতি আর মানুষের জীবনকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ‘খুলিলে মনের দ্বার না লাগে কপাট’— প্রথম উপন্যাস যদি অমরত্ব লাভ করে, তাহলে পাঠকমহলে জনপ্রিয়তা অর্জনের কাজটা স্রষ্টার জন্য বেশ খানিকটা সহজ হয়ে যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ যেমন করেছিল, তেমনি প্রথম প্রকাশেই বাজিমাত করেছিল ‘পথের পাঁচালী’ আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিভূতিভূষণের জন্ম ১৮৯৪ সালে, অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার কাঁচড়াপাড়ার কাছে মামাবাড়ি মুরাতিপুর গ্রামে; পৈতৃক নিবাস বর্তমান ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার বারাকপুর গ্রামে। তাদের পূর্বপুরুষদের আদিনিবাস ছিল বসিরহাট মহকুমার পানিতর গ্রামে। পিতামহ তারিণীচরণ পেশায় কবিরাজ, কবিরাজিতে পসারের আশায় পানিতর থেকে বারাকপুরে চলে আসেন। তিনি অকালে স্ত্রীকে হারান, একাধিক সন্তানও অকালে মৃত্যুর কবলে পড়ে; মহানন্দই তার একমাত্র জীবিত সন্তান, বংশের প্রদীপ। বিভূতির বাবা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন যাকে বলে ভবঘুরে; পেশা ছিল কথকতা— গলা ভালো ছিল, নিজে গান লিখে সেই গান দরাজ গলায় গাইতেন, তাতে নিজে যেমন আনন্দ পেতেন, তেমনি অপরকে বিমোহিত করতে পারতেন; আধ্যাত্মিক সংগীত আর কথকতাকে বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাট্রিক পাশ করতে না পারায় শিক্ষার পাট চুকিয়ে বাবা তারিণীচরণের উদ্যোগে বিয়ে দিয়ে সংসারে বাঁধা পড়েন। মা মৃণালিনী দেবী ছিলেন মহানন্দর দ্বিতীয় স্ত্রী; প্রথম স্ত্রী হেমাঙ্গিনী নিঃসন্তান ছিলেন, সন্তানলাভের আশায় তারই আগ্রহ আর অনুরোধে এই বিয়ে। বিভূতিভূষণ এই মায়ের প্রথম সন্তান তথা পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। বাবার মরমীভাব আর সৃজনশীলতার সঙ্গে বিভূতিভূষণের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু সৃষ্টিশীল প্রতিভা উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা থেকে ছেলের কাছে সঞ্চারিত হয় না— তা একান্তই স্বোপার্জিত হয়তো। বিভূতির নিরন্তর প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম আর একনিষ্ঠ সাধনার ফসল তার অসামান্য সাহিত্য সম্ভার।
বিভূতিভূষণের লেখাপড়ার গোড়ার দিনগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ‘বর্ণপরিচয়’-এর। মাসের প্রথমেই সাড়ে সাত আনা পয়সা দিয়ে এক মাসের ‘বর্ণপরিচয়’ কিনে রাখতেন মহানন্দ। রোজ সকালে এক পয়সা দামের একটা ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়েই পড়া শুরু হতো; সন্ধ্যার পরে সেই বইয়ের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। বাবার জিম্মা থেকে হরি রায়ের পাঠশালা, তার পরে হুগলি জেলার শাগঞ্জ-কেওটা, অবশেষে মহানন্দের কলকাতা বাসের কালে বৌবাজারের আরপুলি লেনের পাঠশালা— এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সম্পন্ন হয় তার প্রাথমিক শিক্ষা। এর সঙ্গে পাঁচ বছর বয়স থেকেই বাবার কাছে সংস্কৃত আর মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ পাঠ। বনগ্রাম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটাও একটা গল্প। মহানন্দ বাড়িতে থাকতেন না; প্রবল অভাবের সংসারে ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার আশা পোষণ করতেন না মৃণালিনী। এদিকে বিভূতিভূষণ দেখতেন, প্রতিবেশীর ছেলেরা বনগ্রামে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। তারও খুব ইচ্ছে হলো; দ্বিধা কাটিয়ে কোনো এক ইংরেজি বছরের মাঝামাঝি গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন। ‘লক্ষ্মীর ঝাঁপি’ থেকে সিঁদুর মাখানো টাকা দিলেন মৃণালিনী। কড়া নজর ছিল প্রধান শিক্ষক চারুচন্দ্রের। প্রথম দু’দিন ভয়ে স্কুল কম্পাউন্ড অবধি গিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন বিভূতিভূষণ। তৃতীয় দিন তাকে ডেকে পাঠান প্রধান শিক্ষক; সিঁদুর মাখানো টাকা দেখে আসল ঘটনা জানতে চান আর জানার পরে ছাত্রের বেতন মাফ করে দেন; বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ করে দেন। পড়াশোনা চলতে থাকে। তিনি যখন ক্লাস এইট, প্রয়াত হন মহানন্দ। সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন বিভূতিভূষণ। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফরম পূরণের ফি জোগাড় করতে শেষমেশ মায়ের কোমরের রুপার বিছা বেচতে হয়। এরপর কলকাতার রিপন কলেজে ছোটমামা বসন্তকুমারের অর্থ সাহায্যে ভর্তি হন; টিউশনি করে প্রধানত চলত, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও মাঝেমধ্যে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। ১৯১৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ওই কলেজেই বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন; ১৯১৮ সালে রিপন কলেজ থেকে ডিসটিংশন নিয়ে বি.এ পরীক্ষায় পাশ করেন। তার পরে কিছু দিন এমএ আর ল ক্লাসে পড়েছিলেন।
এমএ আর ল ক্লাসে পড়ার সময়েই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় নীরদচন্দ্র চৌধুরীর যাকে আমরা পরে নীরদ সি চৌধুরী নামে চিনেছি। তিন বছরের ছোট-বড় এই দুই সহপাঠীর ঘনিষ্ঠতার কথা সুবিদিত। মূলত সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই দু’জনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। নীরদচন্দ্রের বিয়ে হয়নি তখনও; অন্যদিকে গৌরীদেবীর মৃত্যুতে বিভূতিভূষণ সদা-বিচলিত। সেখানেই একই মেসের বাসিন্দা নীরদচন্দ্র ‘পথের পাঁচালী’ শেষ করার জন্য তাগাদা দিলেন বন্ধুকে— প্রায় তিন বছর ধরে। নীরদচন্দ্রের লেখায় পাওয়া যায়, ‘১৯২৪-এ প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা লিখিয়াই তিনি আমাকে পড়িয়া শুনাইয়াছিলেন। আমি এত আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে তিনবৎসর কাল তাহাকে তাড়া দিয়া চলি। ১৯২৮-এ উহা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হইবার পর আমি এক প্রকাশককে খুঁজিয়া পাই যিনি উহা গ্রন্থাকারে ছাপিতে সম্মত হন।’
বিভূতিভূষণের একাকিত্বের কথাও বলেন নীরদচন্দ্র— প্রায় সন্ধ্যাতেই তার সঙ্গে সময় কাটাতে আসতেন বিভূতিভূষণ, বন্ধুর কাছে স্ত্রীবিয়োগের যন্ত্রণার কথা বলতেন। তবে বিভূতিভূষণের আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা চালানোর ব্যাপারটা জানতেন না নীরদচন্দ্র; পরে সে সব কথা জেনেছেন ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের ভিতর দিয়ে। তার কাছে তাই বিভূতিভূষণই স্বয়ং ‘অপরাজিত’।
বিভূতিজীবনের প্রথমপর্বের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি গৌরী। বসিরহাটের মেয়ে গৌরীদেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় তার— চৌদ্দ বছরের সুন্দরী কিশোরী, গৌরবর্ণা, সংস্কৃতিমনাও কম ছিলেন না; বই পড়তে ভালোবাসতেন, গান শুনে আনন্দ পেতেন। কনে ছিলেন পানিতর গ্রামের জমিদার তথা মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে— পানিতর তাদের পূর্বপুরুষদেরই আবাসস্থল। পড়ার খরচ জোগাবেন এই শর্তে ২৩ বছরের যুবকের বিয়ে ঠিক হয়; বিভূতিভূষণ পরে স্বীকার করেছেন, ‘গৌরীর সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হলো, তখন গৌরী কেমন দেখতে ইত্যাদি কোন কথাই আমার মনে উদয় হয়নি, শুধুমাত্র তারা আমায় পড়াবেন, ব্যস এতেই আমি রাজী হয়েছিলাম।’
কলকাতা থেকে কিশোরী স্ত্রীর জন্য রবীন্দ্র কাব্য, গল্পের বই নিয়ে যেতেন। ধনীর মেয়ে গৌরী দেমাকী ছিলেন না; এতটা হীনদশা যে বারাকপুরে তাদের শোবার ঘর ছিল মাত্র একটি— গৌরী থাকতে বিভূতিভূষণ বাড়ি এলে রাতে মা মৃণালিনীকে পাশের সইবাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে হতো; গৌরী কখনো অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। গৌরীর চিঠি ছিল ভালোবাসা আর ব্যাকুলতায় ভরা; পাতলা প্যাডের কাগজে উড়ন্ত পাখির ছাপ, নিচে হয়তো লেখা ‘যাও পাখি বল তারে। সে যেন ভোলে না মোরে।’
চিঠিগুলোও যে কী মিষ্টি!
‘শ্রীচরণকমলেষু, আপনাকে অনেকদিন দেখিনি। আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আপনি এসে মাকে যেন বলবেন না যে আপনাকে আমি চিঠি লিখেছি। আপনি বলবেন, আমি নিজেই এসেছি। গুরুজনদের প্রণাম। ছোটদের আশীর্বাদ। ইতি গৌরী।’
লক্ষণীয়, স্বামীকে ‘তুমি’ নয়, ‘আপনি’ সম্বোধন। কিন্তু এ-সুখ স্থায়ী হয়নি; বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ‘বিসূচিকা’ যাকে আমরা কলেরা নামে চিনি সে রোগে মারা যান গৌরীদেবী— ১৩২৬ সনের ৬ই অগ্রহায়ণ (১৯১৮), একই সঙ্গে গৌরীর মা-ও কলেরায় মারা যান। টেলিগ্রামে সংবাদ পেতে দেরি হয়; পানিতরে পৌঁছে বাড়ির নিকট গিয়ে শোনেন, সৎকারও হয়ে গেছে; শ্বশুরবাড়ি প্রবেশ না করেই উদ্ভ্রান্তের মতো ফিরে আসেন বিভূতি। মা জিজ্ঞাসা করলে একটু ম্লান হেসে বলেছিলেন, ‘গৌরী মারা গেছে, মা।’ কনিষ্ঠ ভ্রাতৃবধূ যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবরণে এই করুণ দৃশ্য ধরা আছে। ১৯১৯-এর জানুয়ারিতে তার আর্তনাদ: ‘হাতে নেই পয়সা, মনেও যথেষ্ট অবসাদ ও হতাশা। গৌরী সেবার মারা গিয়েছে।’
নীরদচন্দ্র লিখেছেন, ‘সর্বোপরি ছিল তাহার শোকের তিক্ততা... মৃদু তৈলপ্রদীপের আলোকে, কলিকাতা হইতে আগত শেষ ট্রেনের বাঁশি মনে করাইয়া দিত যে ঘুমাইবার সময় হইয়াছে। স্ত্রীর মৃত্যু তাহাকে তেইশ বৎসর বিবাহ করিতে দেয় নাই।’ এই শোকে তিনি অতিমাত্রায় আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠেন; টালিগঞ্জ খালের পুল পেরিয়ে পুঁটিয়ারির দিকে হাঁটতে হাঁটতে এক সন্ন্যাসীর সাক্ষাৎ পান, বলেন ‘আমি গৌরীকে দেখতে চাই’; সন্ন্যাসী প্ল্যানচেটে আত্মঅবগাহনের পদ্ধতি শেখান। থিওসফিক্যাল সোসাইটিতে যাতায়াত, প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘অন দ্য সোল’ চক্রাধিবেশে গৌরীর আত্মাকে ডেকে আনার প্রয়াস চলে। নীরদ চৌধুরীর ভাষায়, ‘পরলোকে বিশ্বাস তাহার বিশ্বাস নয়, কুসংস্কার হইয়া উঠিয়াছিল।’ বন্ধুরা পুনর্বিবাহ দিতে চাইলে পাত্রী দেখতে যেতেন— ‘আমি তিনবার তাহার সহিত পাত্রী দেখিতে গিয়াছিলাম’— কিন্তু শেষে এড়িয়ে যেতেন।
এই দারিদ্র্য আর ক্ষুধার অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যের প্রাণ হয়ে উঠেছে। ‘তালনবমী’র আগের রাত জুড়ে গোপাল স্বপ্ন দেখেছিল— ‘খোকা, কাঁকুড়ের ডাল্না আর নিবি? মুগের ডাল বেশি করে মেখে নে... খোকা যাই তাল কুড়িয়ে দিয়েছিলি, তাই পায়েস হল!... খা, খা,— খুব খা— আজ যে তালনবমী রে...’ বিভূতিভূষণের অনেক চরিত্রই এমন অভুক্ত। ‘পথের পাঁচালী’তে ছিল অপু-দুর্গার আশ-শ্যাওড়ার ফল খাওয়ার গল্প— ‘...লুব্ধ দরিদ্র ঘরের বালক-বালিকাদের জন্য তাই করুণাময়ী বনদেবীরা বনের তুচ্ছ ফুলফল মিষ্টি মধুতে ভরাইয়া রাখেন।’ ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’-এর গোড়ায় জিতুর দাদার হতাশা: ‘মাছ তো কম কেনা হয়নি... এত মাছ সব হারু আর ভুন্টিরা খেয়ে ফেলেচে! বাবারে, রাক্কোস্ সব এক-একটি! একখানা মাছও খেতে পেলাম না।’ ‘সই’, ‘পুঁইমাচা’ বা ‘অনুবর্তন’-এ বারবার খিদে উঠে এসেছে। ‘পথের পাঁচালী’ প্রসঙ্গে দিলীপকুমার রায়কে এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘দৈনন্দিন ছোটখাটো সুখ-দুঃখের মধ্যে দিয়ে যে জীবনধারা ক্ষুদ্র গ্রাম্য নদীর মত মন্থর বেগে অথচ পরিপূর্ণ বিশ্বাসের ও আনন্দের সঙ্গে চলেছে— আসল জিনিসটা সেখানে... নভেল কেন কৃত্রিম হবে?’
জীবিকা, ভ্রমণ, সাহিত্যসৃষ্টি আর গদ্যের সৌকর্য
বিএ পাশের পর পড়াশোনায় ইতি ঘটে বিভূতিভূষণের; মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে তিনি শিক্ষকতা নেন হুগলির জাঙ্গিপাড়ার দ্বারকানাথ হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে, পরে সোনারপুরের হরিনাভির দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অ্যাংলো সংস্কৃত বিদ্যালয়ে (১৯২০-এর জুন থেকে ১৯২২-এর জুলাই)। জাঙ্গিপাড়ায় নতুন প্রধান শিক্ষক রাজকুমার ভড় নিযুক্ত হলে তার পদাবনতি ঘটে— সহকারী প্রধান শিক্ষক থেকে সাধারণ শিক্ষক; এই অপমান তিনি মানতে পারেননি। হরিনাভিতেই ‘বালক-কবি’ পাঁচুগোপাল ওরফে যতীন্দ্রমোহন রায়ের সঙ্গে আলাপ। কলকাতার এক প্রকাশক ‘ছয় আনা গ্রন্থাবলী’ নামে সিরিজ বার করত; রবীন্দ্রনাথের লেখা দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই সিরিজ। তেমনই একটি বই দিয়ে যতীন্দ্রমোহন প্রস্তাব করেছিলেন— ‘আসুন আপনাতে আমাতে এইরকম একটা উপন্যাস সিরিজ বের করা যাক।’
তারপর বিভূতিভূষণের অজ্ঞাতে স্কুলের নোটিশবোর্ডে, দেওয়ালে, নারকেল গাছের গায়ে তার আসন্ন উপন্যাস প্রকাশের পোস্টার পড়ে যায়। ‘জীবনে কখনও গল্প লিখিনি, কি করে লিখতে হয় তাও জানা নেই’— তবু লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচতে গল্প লিখলেন; নাম হয় ‘পূজনীয়া’, প্রকাশিত হয় ‘উপেক্ষিতা’ নামে ‘প্রবাসী’-তে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রশংসা পায়। সেই-ই লেখার শুরু। হরিনাভির ব্রাহ্মণ পরিবারের জ্ঞান লাহিড়ীর ভাইঝি ফুলি তার জামার পকেটে বাসি ফুলের পাপড়িতে ঢাকা গৌরীর চিঠি আবিষ্কার করেছিল; কিশোরীর অতিরিক্ত মনোযোগে বিব্রত হয়ে তিনি চাকরি ছাড়েন।
এরপর স্বল্প বেকারত্বের পর মাড়োয়ারি কেশোরাম পোদ্দারের গোরক্ষিণী সভার প্রচারকের চাকরি— বেতন সেই পঞ্চাশ টাকা, কাজ গো-হত্যার বিরুদ্ধে ঘুরে ঘুরে প্রচার, বিশেষ করে মুসলমানপ্রধান চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলে। এই সুবাদে কুষ্টিয়া থেকে রাজবাড়ী, বরিশাল, ঝালকাঠি, চট্টগ্রাম, চন্দ্রনাথ, সীতাকুণ্ড, মহেশখালি, সোনাদিয়া দ্বীপ, মংডু ব্রহ্মদেশ, আরাকান ইয়োমা, নোয়াখালী, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা— সর্বত্র ঘুরে বেড়ান। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে এসে তার ভাষ্য: ‘প্রতিদিন বেলা পড়তে আমি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের তলায় একটি ঝর্ণার ধারে বেড়াতে যেতুম। সন্ধ্যাবেলায় স্থানটা এক অপরূপ শ্রী ধারণ করত। গাছপালার শ্যামলতা, বনকুসুমের শোভা, সম্মুখের শৈলশ্রেণীর গম্ভীর উন্নত সৌন্দর্য, বনের পাখির ডাক, ঝরণার কুলকুল শব্দ – আর সকলের উপরে স্থানটির নিবিড় নির্জনতা আমাকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় টেনে নিয়ে যেতো সেখানটিতে।’ গৌরীর মৃত্যুর আগে এই ভ্রমণপিপাসা তেমন ছিল না; বিচ্ছেদ-দগ্ধ হৃদয়কে প্রশান্তি দেওয়ার প্রয়াসই তার দেশভ্রমণে ইন্ধন জুগিয়েছে।
এরপর পাথুরেঘাটার জমিদার খেলাতচন্দ্র ঘোষ এস্টেটে সিদ্ধেশ্বরী ঘোষের অধীনে— প্রথমে ভাগ্নে বালক বিভূতিকে পড়ানোর কাজ, পরে সেক্রেটারি; সততা আর বিশ্বস্ততায় আস্থাভাজন হয়ে বছরখানেকের মধ্যে ভাগলপুর জঙ্গল মহলের অ্যাসিট্যান্ট ম্যানেজার। জঙ্গলমহলের বিস্তার— উত্তরে আজমাবাদ থেকে দক্ষিণে কিষাণপুর, পূর্বে ফুলকিয়া, লবটুলিয়া, নাড়াবইহার, পশ্চিমে মুঙ্গের জেলার সীমান্ত পর্যন্ত। ঘোড়ায় চড়ে মহলের তদারকি করেন। এখান থেকেই ‘পথের পাঁচালী’-র প্রথম লেখা শুরু, ‘আরণ্যক’-এর মালমশলা সংগৃহীত হয়। জঙ্গলমহলের নিকটস্থ ভাগলপুর শহরে এক উসকোখুসকো চুলের উদাসমুখ বালিকা তার চোখে পড়ে— এই বিচিত্র বালিকা তো অপুর সঙ্গে উপন্যাসে জায়গা পেতে পারে। প্রথমে যে ‘পথের পাঁচালী’ রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন, তা ছিল দুর্গাবিহীন; আগের পাণ্ডুলিপি রেখে নতুন করে লিখতে শুরু করেন; দুর্গা স্থান পায়, অপুর বড় বোন হয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে ওঠে। তিন বছরের একটানা অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ‘পথের পাঁচালী’— প্রথমে ‘বিচিত্রা’য় ধারাবাহিকভাবে, পরে বই আকারে প্রকাশিত হলো ১৯২৫ সালে। বিচিত্রার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রেই অখ্যাত লেখকের প্রকাশের সুযোগ। প্রকাশের পর গোপাল হালদারের মূল্যায়ন, ‘কোন বাঙালী লেখক সাহিত্যেক্ষেত্রে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এমন শুভকামনা ও অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করেছিলেন কিনা সন্দেহ।’ ছয় বছরের জঙ্গলমহলের ম্যানেজারি ছেড়ে কলকাতায় এসে খেতাবচন্দ্র ক্যালকাটা ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা নেন। ‘তৃণাঙ্কর’-এ নতুন উপন্যাসের সূচনার বিবরণ, ‘ভারী ঘটনাবহুল দিনটি। ভোরে উঠে প্রথমে গেলুম হেঁটে ইডেন গার্ডেনে... কেয়াঝোপে খানিকটা বসে বসে আলোক সারথির ছক কাটলুম।’ পরে নাম হয় ‘অপরাজিত’।
‘পথের পাঁচালী’-তে কোনো বীরত্ব নেই, আছে অপু-দুর্গা-হরিহর-সর্বজয়ার দারিদ্র্যময় জীবনসংগ্রাম। অপুর প্রকৃতি-চেতনার জাগরণে: ‘অস্তবেলার সোনাডাঙার মাঠের উপরকার আকাশে কতো বর্ণের মেঘের খেলা, ভাদ্রের শেষে ফুটন্ত কাশফুলে ভরা মাধবপুরের দূরপ্রসারিত চর, চাঁদনি রাতে জ্যোৎস্না-জালের খুপরিকাটা বাঁশবনের তলা,— অপুর স্ফুটনোনুখ কৈশোরের সতেজ আগ্রহভরা অনাবিল মনে ইহাদের অপূর্ব বিশাল সৌন্দর্য চিরস্থায়ী ছাপ মারিয়া দিয়াছিল।’ ‘অপরাজিত’-এ: ‘নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে আসার পরে... অপু উপলব্ধি করেছে প্রকৃতি-বিযুক্ত জীবন কতো ভয়ংকর, নির্মম ও শ্রীহীন।’ সন্তান প্রসবকালে স্ত্রী অপর্ণার মৃত্যুতে অপুর দশা লেখকের নিজের জীবনের ছায়ামাত্র। ‘আরণ্যক’-এ: ‘প্রকৃতি তার নিজের ভক্তদের যা দেন তা অতি অমূল্য দান। অনেকদিন প্রকৃতির সেবা না করিলে কিন্তু সে দান মেলে না’; ‘জ্যোৎস্না আরো ফুটিয়াছে... এ স্বপ্নভূমি... বনের ফুল যারা ভালোবাসে না, সুন্দরকে চেনে না, দিগ্বলয়রেখা যাদের কখনো হাতছানি দিয়ে ডাকে নাই, তাদের কাছে এই পৃথিবী ধরা দেয় না কোনো কালেই’; ‘এখানকার আদিম অরণ্য – পর্বতের সঙ্গে মানুষগুলিও অভিন্ন। যীশুখ্রীষ্ট যেদিন ক্রুশে বিদ্ধ হয়েছিলেন, সেদিনও এখানকার লোকগুলি মহুয়া বীজ ভেঙে তেল বের করত, আজও তাই করছে। কত সরল, এরা কত গরীব অথচ কী আনন্দময় উচ্ছলিত জীবনধারা।’ যুগলপ্রসাদ সম্পর্কে: ‘ও আর এক ধরনের ব্রাত্য মন লইয়া পৃথিবীতে আসিয়াছে– জমিজমা গরুমহিষের আলোচনা করিতে ভালবাসে না, তাহাতে যোগ দেয় না।’ আরণ্যকের উৎসর্গ: ‘এই উপন্যাসখানি গৌরীকে দিলাম।’ ‘ইছামতী’র জন্য মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার। ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’, ‘বিপিণের সংসার’, ‘অশনি সংকেত’ (আদতে মন্বন্তরের দলিল), ‘পুঁইমাচা’-এর মতো গল্প স্মরণীয়। ‘চাঁদের পাহাড়’-এ আফ্রিকা না দেখেই এইচএইচ জনস্টন, রোসিটা ফোর্বসের মতো পর্যটকের বই পড়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন; উপন্যাসটি খুকুকে উৎসর্গিত।
১৯৪৩ সালের শেষ দিকে শীতকালে বন আধিকারিক যোগেন্দ্রনাথ সিংহের আমন্ত্রণে সারান্ডার জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে লিখলেন ‘দেবযান’। মুগ্ধ হয়েছিলেন এতটাই যে এক দিন রাত দেড়টা অবধি জেগে ছিলেন; মাথার উপরে দ্বিতীয়ার চাঁদ, পাশে কোয়না নদী— তার মধ্যে বসে লিখেছিলেন: ‘অরণ্যই ভারতের আসল রূপ, সভ্যতার জন্ম হয়েচে এই অরণ্য-শান্তির মধ্যে, বেদ, আরণ্যক, উপনিষদ জন্ম নিয়েচে এখানে— এই সমাহিত স্তব্ধতায়— নগরীর কোলাহলের মধ্যে নয়।’ জীবনের প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত লিখেছেন— শেষ দশ বছর ব্যারাকপুরে থাকাকালীন লিখেছেন ‘অশনি সংকেত’ বা ‘ইছামতী’র মতো কালজয়ী উপন্যাস; মৃত্যুর ঠিক পাঁচ-সাত দিন আগে পুজোর ছুটিতে শেষ করেছিলেন জীবনের শেষ গল্প ‘শেষ লেখা’, পরে যা তার লেখার বাক্স থেকে উদ্ধার হয়।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘বিভূতিভূষণ আর সমস্ত সার্থক-কর্মা দিব্যদৃষ্টি লেখকের মত এই দুইটি প্রধান বিষয় বা বস্তু নিয়েই যা কিছু বলবার তা বলে গিয়েছেন’— সেই দু’টি হলো প্রকৃতি আর মানুষ। তার গদ্যের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব সরলতা— ভাষা গ্রামীণ কথকতার মতো সহজ, সাবলীল, হৃদয়স্পর্শী; প্রাঞ্জল, সুললিত, কবিত্বমণ্ডিত। কোনো জটিল বাক্যবিন্যাস বা কৃত্রিম অলংকারের বোঝা নেই। তিনি কোনো নিরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি, তবু স্বতঃস্ফূর্ততায় অনন্য। ‘পথের পাঁচালী’-র প্রকৃতি এত জীবন্ত, সরস আর প্রাণময় যে দুর্গা-অপু যেন সে-প্রকৃতিরই সন্তান।
বিভূতিভূষণের উপন্যাসপাঠ এক বিরল আর সুখকর অভিজ্ঞতা। তার দৈনন্দিন রুটিনও ছিল মজার— খুব ভোরে ওঠা, গরম-শীতে ইছামতীতে স্নান, ফিরে দিনলিপি আর চিঠির উত্তর, সাতটায় প্রাতরাশ, নয়টায় স্কুলের পথে যাত্রা (গোপালনগর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে যাওয়ার সময় সদ্য-ভাঙা গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে যেতেন), বিকেলে ইছামতী বা বাওড়ের ধারে গাছের ডালে বসে আকাশের বদলাতে থাকা রং দেখা, প্রতিবেশী ছেলেমেয়েদের পড়ানো। প্রিয় ফল ছিল আম আর কাঁঠাল; ভালোবাসতেন চাঁপা, বকুল, শেফালি ফুল; বন্য ফুলের মধ্যে ঘেঁটু আর ছোট এড়াঞ্চি। পড়তেন সাহিত্যের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা; শেষ জীবনে পরলোকতত্ত্ব। বই আলমারিতে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন না— সারা বাড়িতে ছড়ানো থাকত। পুজোর ঠিক কয়েক দিন আগে ঘাটশিলা চলে যেতেন, ফিরতেন মাঘের শেষে বা ফাল্গুনের গোড়ায়; সেখানে প্রমথনাথ বিশী, বিশ্বপতি চৌধুরী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, প্রবোধকুমার সান্যাল, বাণী রায়, সুমথনাথ ঘোষ, নীরদরঞ্জন দাশগুপ্তদের আড্ডা জমত। এঁদেলবেড়ের জঙ্গল, সুবর্ণরেখা নদী, পাণ্ডবশীলা, কাছিমদহ রাত-মোহনা ছিল তার প্রিয় ভ্রমণক্ষেত্র; ফুলডুংরি পাহাড়ের পিছনে পাথরের উপরে বসে উপাসনা করতেন। বাড়ির সামনের কূর্মাকৃতি পাথরখণ্ডের নাম দিয়েছিলেন ‘কূর্মকূট’; ঘাটশিলার বাড়ির নাম ‘গৌরীকুঞ্জ’।
জীবনের নারীরা
গৌরীর মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণের জীবনে কয়েকজন নারীর পদধ্বনি শোনা যায়। জন্মভূমি বারাকপুরের প্রতিবেশী আর হাইস্কুলে তার শিক্ষক যুগল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে খুকু ওরফে প্রীতিলতা— দশ-এগারো বছর বয়স থেকে পরিচয়, পরে ষোড়শী তরুণী; স্লেট-পেনসিল নিয়ে পড়তে আসা খুকুকে মেটে প্রদীপের আলোয় একা একা পড়াতেন, নিজে লিখতেন ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’। অমিয়া চৌধুরাণীর চোখে খুকু: ‘নিটোল স্বাস্থ্য, দোহারা গড়ন, মাজা রঙ। চোখেমুখে গ্রাম্য সরলতার ছাপ, পরনে লালপেড়ে টিয়ারঙ শাড়ি। হাতে বেলোয়ারি বালা। খালি পা ধুলোমাখা।’ সুপ্রভাকে লেখা চিঠিতে বিভূতিভূষণ: ‘তাকে বই পড়ে শোনাই, আমার কাছ থেকে বই পত্রিকা নিয়ে পড়ে। তারও নিঃসঙ্গ জীবন, সে একটু অন্যধরনের মেয়ে, পাড়াগাঁয়ের পাঁচজন মেয়ের মত নয়’; ‘পাড়ায় এখন কেউ নেই... খুকু আছে, তাও রক্ষে। খুকু আজকাল বড় হয়েছে... নানা ছলছুতায় সে আসে – তাও বুঝতে আমার দেরি হয় না।’
১৯৩৪ সালের ১০ জুনের দিনলিপি: ‘খুকুর সঙ্গে সন্ধেবেলা কত কথা হোল। আমি বললুম, তুই বাড়ুজ্যে না হলে তোকে বিয়ে করতুম। ও হাসলে– বললে, আপনি চলে গেলে আমার মন পালাই পালাই হবে।’ খুকুর বিয়ে হয় ১৩৪৬ সনের আষাঢ়ে; তিনি সম্মতি দেন, অনটনগ্রস্ত পিতাকে পাঁচশো টাকা সাহায্য করেন, কিন্তু বিয়েবাড়িতে দেরিতে পৌঁছে শেষরাতে রাত তিনটার ট্রেনে কলকাতায় ফিরে যান।
এরপর সুপ্রভা দত্ত— সিলেটের সুনামগেঞ্জর মিরাশী গ্রামের ধনী পরিবারের মেয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এমএ শেষবর্ষের ছাত্রী, নিজে কবি, ‘নির্ঝর’ পত্রিকার সম্পাদক, নীরদ-স্ত্রী অমিয়ার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের সহপাঠী। সিনেট হলে বিজ্ঞান কংগ্রেসে, আশুতোষ হলে জাপানি কবি ইয়োনে নোগুচির কবিতাপাঠে, ‘চিত্রা’ হলে মুক্তি সিনেমায়— দুজন একত্রে। সুপ্রভার হাতে কাজ করা রুমাল উপহার, শিলংয়ে দেখা করতে একাধিকবার যাত্রা, পূজার পার্সেল— ‘তোমার পার্সেলটা গত বৃহস্পতিবার হাতে পেয়েছিলুম... বালিশ ঢাকনিটা বেজায় সৌখিন... রুমাল ভারী সুন্দর, তোমার হাতের কাজ বলে জিনিসগুলি আমার কাছে এত মূল্যবান হয়ে উঠবে যে ওসব আমি আর ব্যবহার করতে পারবো না।’
১৯৩৮ সালের স্মরণীয় চিঠি: ‘কত লোকের অর্থাৎ কত মেয়ের সঙ্গে তো তারপর আলাপ হলো– কিন্তু তোমার সঙ্গে প্রথম আমলের যে ভালবাসা, এমনটি আর হোল কৈ আর কারো সঙ্গে? তা হয় না। একজায়গায় একবার হোলে দু’জায়গায় হয় না। আমি কথাটা এতদিন ভাল বুঝতাম না – আজকাল বুঝি।’
তবু বিয়ে হয়নি— বারাকপুর যার শেষ গন্তব্য, সেই অতি সাধারণ গ্রামে পরিশীলিত সুপ্রভাকে ‘শৈলশিখরের রম্য ভিলা থেকে এই দুঃখময় জীবনের মধ্যে নামিয়ে আনতে’ তিনি পারবেন না; কায়স্থ-ব্রাহ্মণের বর্ণগত সমস্যাও প্রচ্ছন্ন। সুপ্রভাকে ‘জীবন ও মৃত্যু’ গল্পগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। এদিকে খুকুর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা দিনলিপিতে: ‘আইভান হো অনুবাদ করছিলুম, শিউলি গাছে ফুল ফুটত... বনগাঁয়ে ছাদে বেড়ানোর দিনটি, আর গতবছর ছুটিতে বারাকপুরে গ্রামোফোন নিয়ে কাটানোর দিনগুলির কথা ভুললে চলবে না।’ সুপ্রভার সঙ্গেও ‘দেওঘরে ও ঈস্টারের ছুটিতে শিলং-এ বেড়াতে যাওয়ার দিনগুলি’ চিরদিন মনে থাকবে।
শেষে জীবনের চতুর্থ নারী রমা ওরফে কল্যাণী। একটা অদ্ভুত ঘটনা এখানে— ইছামতী নদীতে স্নান করতে নেমে ডুবে যান বিভূতিভূষণের বোন জাহ্নবীদেবী; সেই খবরের সূত্রেই প্রখ্যাত লেখকের ঠিকানা এসে পৌঁছায় ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কন্যা রমাদেবীর কাছে। বাবার দেওয়া আকাশি-নীল রঙের সোনালি ঢেউ খেলানো শাড়ি পরে রমাদেবী দেখা করতে যান; লেখক তখন বড়ই বিষণ্ণ— অটোগ্রাফ খাতায় সই করে লিখে দিলেন: ‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু।’ রমাদেবী বিয়ের প্রস্তাব দিলে সময় চাইলেন বিভূতিভূষণ; বললেন, ‘আমার সাথে তোমার বয়সের অসম্ভব তফাত। তুমি না হয় ছেলেমানুষ, বুঝতে পারছ না, কিন্তু আমি একজন বয়স্ক লোক হয়ে কি করে তোমাকে ডোবাই?’ এমনকি ‘দেখ আমার গায়ের রোমে, মাথার চুলে পাক ধরেছে’— এ-ও বললেন। কিন্তু রমাদেবী নাছোড়: ‘আপনাকে মাত্র দশদিনের জন্য স্বামী হিসেবে পেলে আমি ধন্য।’ ৩ ডিসেম্বর ১৯৪০ সম্পন্ন হলো সেই শুভকাজ; সাত বছর পরে জন্ম পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বাবলু)। বিয়ের পরের চিঠি: ‘মনে মনে কতদিন থেকে তোমার মতই মেয়ে চেয়েছিলুম – স্নেহময়ী, ভাবোচ্ছ্বাসময়ী, সেবাপরায়ণা, সুরসাধিকা...’ রমার বাবা ষোড়শীকান্ত ছিলেন ভৈরবীর কাছে দীক্ষা নেওয়া তান্ত্রিক, পরলোকতত্ত্বে অবিচল বিশ্বাসী। গৌরীর স্মৃতি এতই প্রবল যে চাঁপাফুল তার প্রিয় ফুল হয়ে ওঠে; পরিমল গোস্বামীর সামনে পড়ে গিয়ে সলজ্জ হেসে বলেছিলেন ‘রোজ কিনি’।
যমুনার স্মৃতিচারণ: ‘দিদির কাছে শুনেছি, ওঁদের ফুলশয্যার রাত্রে বড়ঠাকুর শুধু মার কথা ও প্রথম স্ত্রী গৌরীদির কথা বলেছিলেন... গৌরীর ফুলশয্যা প্রচুর চাঁপাফুল দিয়ে হয়েছিল।’ রমা আর যমুনা ঘাটশিলায় ও বারাকপুরে চাঁপাগাছ লাগান। ঘাটশিলায় অশোকগুপ্তের কাছ থেকে পাওয়া বাড়ির নাম হয় ‘গৌরীকুঞ্জ’— অশোক গুপ্ত পাঁচশো টাকা ধার শোধ করতে না পেরে বাড়িটি স্বেচ্ছায় লিখে দিয়েছিলেন। গৌরীর হাতে লেখা চিঠি, কারুকাজ করা হাতপাখা সারাজীবন মমতায় আগলে রেখেছেন; নীরদ সি চৌধুরীর ইংরেজি উদ্ধৃতি: ‘I always noticed a packet of papers in his breast pocket and an embroidered hand-made fan by his pillow... I could easily guess that the pocket contained the few letters his wife had written to him and that the fan was made by her.’
গাঁয়ে নতুন বউ এলে নদিদির প্রশ্নে তার উত্তর: ‘গৌরী যেমন নীচুমুখে সন্ধেবেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালত, পায়ে তোড়া, মাথায় আঁচল, তেমন মুখ আর দেখলাম কই?’ নীরদচন্দ্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রবল হলেও জীবনযাপনে তফাত ছিল; নিম্ন-মধ্যবিত্ত বিভূতিভূষণ চিরকালই সাধারণ জীবন যাপন করেছেন।
নীরদচন্দ্রের কলমেই আমরা জানতে পারি— ‘...তিনি নির্বিকার, শান্তভাবে বিড়ি টানিতে টানিতে সোজা তাহার শয়ন কক্ষে চলিয়া যাইতেন এবং সূচী-শিল্প করা চাদরের উপর বসিয়া, দুর্গন্ধময় নিম্ন মধ্যবিত্ত গন্ধ ছড়াইতেন। আমার স্ত্রী তাহাকে বিড়ি ফেলিতে বাধ্য করিয়া, ভৃত্যকে দিয়া একপ্যাকেট খ্যাতনামা সিগারেট আনাইয়া দিতেন।’ তবু বন্ধুত্ব ছিল অটুট। নীরদচন্দ্রের কাছে বিভূতিভূষণ ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী আর স্থিতধী— প্রবল জীবনসংগ্রাম তাকে তেতো করে তুলতে পারেনি, জীবন সম্পর্কে হতাশাও জাগায়নি; বরং সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল করেছিল, গড়ে তুলেছিল তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। বঙ্কিমচন্দ্রও বিশ বছর বয়সে ষোলো বছরের মোহিনীকে হারিয়েছিলেন, শরৎচন্দ্র বার্মায় শান্তিদেবী আর পুত্রকে প্লেগে— কিন্তু বঙ্কিমের প্রকাশ নিতান্ত অপ্রতুল, বিভূতিভূষণের শোক প্রকাশের তীব্রতা আর সৃজনশীল রূপান্তরে তিনি স্বতন্ত্র। তার ভালোবাসাও ছিল অকৃত্রিম; দিনলিপিতে লিখেছিলেন: ‘ভালবাসা Pity নয়, করুণা নয়, Charity নয়, সহানুভূতি নয়, এমন কি বন্ধুত্ব ও নয়, ভালবাসা ভালবাসা। এখন সেই জিনিসের সূক্ষ্ম মহিমা ও রসটুকু না বুঝে যে নষ্ট করে ফ্যালে অযাচিতভাবে দিয়ে, অপাত্রে দিয়ে— তার চেয়ে বড় মূর্খ আর কে?’
সত্যজিৎ রায়ের বিভূতিভূষণ
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’-র প্রথম পরিচয় সিগনেট প্রেসে— ‘আম আঁটির ভেঁপু’-র প্রচ্ছদ আর ইলাস্ট্রেশনের দায়িত্ব পেয়ে; সেই ছবিগুলোই পরে চলচ্চিত্রে শট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫২ সালের অক্টোবরে দুই শিশুশিল্পী উমা দাশগুপ্ত আর সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে লোকেশনে রওনা; আর্থিক সংকটে নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়, স্ত্রীর গয়না বন্ধক রাখতে হয়; শেষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঋণে ১৯৫৫ সালে মুক্তি, ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। উপন্যাসের প্রাকৃতিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রায় সমস্ত ছবি গ্রামাঞ্চলে তোলা। ‘অপু ত্রয়ী’ বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের গভীরতা প্রতিষ্ঠা করে; ‘চাঁদের পাহাড়’-ও চলচ্চিত্ররূপ পায় আর মূল রচনার মতোই জনপ্রিয় হয়।
‘পথের পাঁচালী’ সিনেমাটি বানানোর বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও নির্মাণকাহিনি পাওয়া যায় সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘অপুর পাঁচালী’ বইয়ে। কোন উপন্যাস থেকে ছবি নির্মাণের হাতেখড়ি হবে, তা নিয়ে চলছিল বিস্তর পড়ালেখা। সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, ‘ফিল্ম করবার জন্য কেউ যখন গল্প খুঁজতে বসে, তখন ঠিক কী ধরনের গল্প সে চায়? এ বড় কঠিন প্রশ্ন। যখন ‘পথের পাঁচালি’ পড়ি, ও বইয়ের কয়েকটা ব্যাপারই আমাকে তখন খুব আকর্ষণ করেছিল।…ছবির পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বলে মূল বইয়ের একটানা অনেক বাগ্বিস্তার বর্জন করে ঘটনাগুলিকে আমি একটু অন্যভাবে সাজিয়ে নিই।’
সত্যজিত রায় লিখেছেন, ‘পথের পাঁচালি’র পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য কখনও তৈরি করা হয়নি। থাকবার মধ্যে ছিল শুধু একতাড়া কাগজে লেখা কিছু নোট আর কিছু স্কেচ। ছবিতে এই কাহিনী কোথায় কীভাবে ফুটবে, সেটা বুঝবার জন্য পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যের দরকারও যে আমার ছিল না, তার কারণ, একে তো পুরো কাহিনীটাই আমার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল, তার উপরে আবার ডি.কে.র করা সারাংশ আর চিত্রনাট্যের মূল উপাদানের মধ্যে সাযুজ্যও ছিল কম নয়।’
আজও কেন পড়তে হবে বিভূতিভূষণ
আজকের যান্ত্রিক জীবনে তার সাহিত্য পড়া মানে প্রকৃতির সঙ্গে হারানো সংযোগ ফিরে পাওয়া— ‘প্রকৃতি তার নিজের ভক্তদের যা দেন তা অতি অমূল্য দান’ আজও প্রাসঙ্গিক। তার সাহিত্য সহানুভূতি আর মানবিকতা শেখায়— দুর্গার মৃত্যু, ‘অশনি সংকেত’-এর মন্বন্তর পাঠকের হৃদয় নাড়া দেয়। গ্রামীণ বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির অমূল্য দলিল তিনি রেখে গেছেন; গদ্যের সরল সৌন্দর্য নিজেই এক প্রশান্তি। সবশেষে, তার সাহিত্য শেখায় দারিদ্র্য বা দুঃখই জীবনের শেষ কথা নয়— প্রকৃতি, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর মানবিক সম্পর্কই জীবনকে অর্থপূর্ণ করে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এমন এক নক্ষত্র, যাঁর আলো কখনো নিভবে না। গৌরীর অকালমৃত্যু তাকে যে শূন্যতা দিয়েছিল, তা-ই রূপান্তরিত হয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘আরণ্যক’-এর মতো অমর সৃষ্টিতে। তিনি ছিলেন খাঁটি শিল্পী, যুগোত্তীর্ণ সাহিত্য সাধক— কিন্তু শুধু কথাশিল্পী নন, রক্তমাংসে গড়া মানুষও। আজকের পাঠক ‘পথের পাঁচালী’ হাতে নিলে কেবল একটি উপন্যাস পড়েন না— প্রবেশ করেন এমন এক জগতে, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন; এই মহান কথাকারকে নিয়ে আরও চর্চা হলে আমাদের সাহিত্যচর্চাই দিনে দিনে সমৃদ্ধ হবে।
তথ্যসূত্র
১. রুশতী সেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
২. নীরদচন্দ্র
চৌধুরী, Thy Hand, Great Anarch ও The Autobiography of an Unknown Indian
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, আগামীর সময়
















