হরমুজ শান্তির রুট নাকি নতুন সমীকরণের পথ?

লেখক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ্
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর একটি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয় এ পথ দিয়ে। ফলে এখানে কোনো সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং অর্থনীতিতে।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ প্রথমে প্রকাশ করা হয়নি। পরে সমালোচনা এবং জনমতের চাপে এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করা হয়।
নথিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। ৫ নম্বর ধারায় ইরান নিরাপদ জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, এই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য তিনটি। হরমুজ খুলে দেওয়া। ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিষ্ক্রিয় করা এবং ইরানের আচরণের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া।
নথি অনুযায়ী, সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময় শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির কাঠামো নির্ধারণ করার কথা রয়েছে। প্রকাশিত পাঠে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিষ্ক্রিয় করার জন্য একটি ‘মিনিমাম মেথডোলজি’ বা ন্যূনতম পদ্ধতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া সংস্করণে এ বিষয়টি ছিল না।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে হরমুজের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
প্রথম দৃশ্যপট
সবচেয়ে ইতিবাচক সম্ভাবনা হলো হরমুজ আবার পরিণত হবে স্বাভাবিক বাণিজ্যপথে। স্বাভাবিক হবে জাহাজ চলাচল। অপসারণ করা হবে মাইন। জোরদার হবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা। কমবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ঝুঁকি। এর ফলে কমতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা। স্থিতিশীল হতে পারে জ্বালানির দামও।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট
চুক্তির ভাষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে— ‘ভবিষ্যৎ প্রশাসন’ এবং ‘সামুদ্রিক সেবা’ নিয়ে আলোচনার কথা। এ অংশটিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইরান যদি ভবিষ্যতে নৌ-নির্দেশনা, নজরদারি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা পায়, তাহলে তার কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। হরমুজ তখন আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে আগের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে তেহরানের প্রভাব। এটি অবশ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন শক্তির ভারসাম্যও তৈরি করতে পারে।
তৃতীয় দৃশ্যপট
চুক্তিতে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। আছে তেল রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর কথাও। পাশাপাশি অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনারও উল্লেখ আছে। এসব বাস্তবায়িত হলে ইরানে পেতে পারে অর্থনীতি নতুন গতি। চীন, ভারত, ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো আবার সক্রিয় হতে পারে ইরানের বাজারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নয়। হতে পারে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের একটি নতুন সম্পর্কোন্নয়নের সূচনাও।
চতুর্থ দৃশ্যপট
অন্যদিকে বড় ঝুঁকিও রয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে দেখা দিতে পারে মতবিরোধ। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হতে পারে যেকোনো পক্ষ। এমন হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে দ্রুত। আবারও উত্তেজনা ফিরতে পারে হরমুজে। বাড়তে পারে বীমা ব্যয়। চড়তে পারে তেলের দাম। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হবে।
কিন্তু হরমুজ কি সত্যিই খুলছে?
চুক্তির ঘোষণা মানেই হরমুজ খুলে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত এবং টোলমুক্ত থাকবে। কিন্তু ইরান এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, ভবিষ্যতে কিছু সামুদ্রিক সেবার জন্য ফি নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ দুপক্ষ একই চুক্তিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে।
তবে বড় বিষয় হলো— নিরাপত্তা। যুদ্ধের সময় সমুদ্রে পাতা মাইন সরাতে হবে। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ অপসারণ করতে হবে। এসব কাজ দ্রুত করা সম্ভব নয়। শিপিং কোম্পানি এবং বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো অপেক্ষা করছে। তারা বাস্তব নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। যার ফলে বলা যায়, হরমুজ এখনো পুরোপুরি খোলেনি। খুব দ্রুত খুলেও যাচ্ছে না।
অবশ্য বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, চুক্তির পরপরই সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি সুপার ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ওই তিন ট্যাংকারে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করা হচ্ছে।
পাশাপাশি গত বুধবার থেকে কমপক্ষে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল বহনকারী কয়েকটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অতিক্রম করেছে।
নতুন সংকটের শঙ্কা
আরেকটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। হরমুজ খুললেও কি ভবিষ্যতে তা আবার বন্ধ হবে না? এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইরান ভবিষ্যতেও প্রণালিটিকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
একই সঙ্গে ইয়েমেনের বাব আল-মান্দাব প্রণালিও ঝুঁকির বাইরে নয়। অতীতে হুতি গোষ্ঠীর হামলায় লোহিত সাগরের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। নতুন অস্থিরতা দেখা দিলে সুয়েজ খাল পর্যন্ত এর প্রভাব পৌঁছাতে পারে।
তখন সমস্যা শুধু হরমুজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ, বাব আল-মান্দাব এবং সুয়েজ— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একসঙ্গে চাপে পড়তে পারে।
সামনে কী?
মূল প্রশ্ন হরমুজ খোলা হবে কি না— তা নয়। মূল আলাপ হলো এই সমঝোতা কতটা টেকসই হবে। ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কতদূর যাবে, তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কতটা নমনীয় হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন ব্যবস্থাকে কতটা গ্রহণ করবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
বর্তমানে দুপক্ষই একধরনের উত্তেজনা প্রশমনের পথে হাঁটছে। কিন্তু উত্তেজনা প্রশমন এবং স্থায়ী সমঝোতা এক বিষয় নয়।
আগামী ৬০ দিনের আলোচনা নির্ধারণ করবে এই প্রক্রিয়া স্থায়ী সমঝোতার দিকে এগোবে, নাকি আবারও অবিশ্বাস ও সংঘাতের পুরনো স্ট্যাটাস কু’তে ফিরে যাবে।
একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার যে, হরমুজের ভবিষ্যৎ শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বহু দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
লেখক : বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি সাংবাদিক।





