দুর্গম চরে স্বাস্থ্যসেবার নীরব সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দুর্গম চর মধুয়া ইউনিয়ন। উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এ চরাঞ্চলে হাজারো মানুষের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার একমাত্র সরকারি ঠিকানা চর মধুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র। অথচ যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের জীবন রক্ষার কথা, সেটিই আজ অবহেলা, জনবল সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কার্যত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘রোগী দেখার হাসপাতাল এখন নিজেই রোগী।’
চর মধুয়া শুধু একটি ইউনিয়ন নয়, এটি ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীকও। চারদিকে নদীঘেরা হওয়ায় এখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। হঠাৎ কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে নদীপথই একমাত্র ভরসা। প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা নৌযান সংকটের কারণে অনেক সময় চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই ফুরিয়ে যায় মূল্যবান সময়। ফলে স্থানীয় মানুষের কাছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়।
কিন্তু সেই আশ্রয়ের বর্তমান চিত্র আশার চেয়ে হতাশাই বেশি তৈরি করে। চরের বাসিন্দারা বলছেন, আধুনিক নকশায় নির্মিত ভবনটি এখন অবহেলার স্পষ্ট সাক্ষী। নিচতলার দরজা-জানালা ভাঙা, দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত এবং কক্ষগুলোয় জমেছে ধুলাবালি। বহু আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কোথাও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চিহ্ন নেই। এমনকি সুপেয় পানিরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ন্যূনতম পরিবেশ যেখানে রোগীর আস্থা তৈরি করার কথা, সেখানে ভবনের জীর্ণ অবস্থা উল্টো মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করছে।
তবে শুধু অবকাঠামো নয়, সংকটের আরও বড় কারণ জনবল ঘাটতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কেন্দ্রটি অধিকাংশ সময়ই থাকে তালাবদ্ধ। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা সপ্তাহে শুধু শনিবার এখানে আসেন। বাকি দিনগুলোয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কার্যত অচল থাকে। ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মাঠপর্যায়ের কাজে থাকেন ব্যস্ত। ফলে প্রায়ই খালি হাতে ফিরে যান রোগীরা।
এ অভিযোগের সত্যতা মিলেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও। চর মধুয়া ইউনিয়নের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা শুকতারা বেগম এবং ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মো. ওসমান সিকদার স্বীকার করেন, জনবল সংকটের পাশাপাশি ভবনের অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।




