বারুদবিশ্বে স্বস্তির হাওয়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই দেখল বিশ্ব। দেখল পরিণতিও। একপক্ষ প্রাচীন ইতিহাসের প্রথম পরাশক্তি। অন্যপক্ষ বর্তমান বিশ্বের মোড়ল। দুদিনেই ইরানের সরকার পরিবর্তনের দিবাস্বপ্নটি শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বের লড়াই হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল তার বিশ্ব শাসন দম্ভে। হামলা-পাল্টা হামলায় ঝলসে উঠেছিল মরুর উত্তাল হাওয়া। একজন জাত যোদ্ধা। আজন্ম বীর। মাথা নোয়ানোর নজির নেই রণক্ষেত্রে। আরেকজনের খাপে নয়া ইতিহাস রচনার তলোয়ার। হার স্বীকারে রাজি নয়। ধুলোয় মিশিয়ে দেবে পারস্য সাম্রাজ্যের হাজার বছরের গৌরব। দুপক্ষের দুর্বার রণঝংকারের বারুদ ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্ব রাজনীতিতেও। যুদ্ধের উত্তাপে টগবগ করে ফুটছিল বিশ্ব জ্বালানি। সে আঁচের পোড়া ধোঁয়া ওঠে দেশে দেশে। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সবখানেই। সারা বিশ্বেই। শেষমেশ স্বস্তি ফিরল অস্থির বিশ্বে। যুদ্ধ ফেলে ফ্রান্সের জি৭ সম্মেলন শেষে শান্তিচুক্তিতে সই করল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই শান্তির বাতাস বইছে অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যে। সুখের দেশ সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে আজ সে চুক্তিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কথা ছিলো দুই দেশের। বহুমূল্যে পাওয়া ইরানের এ জয়ের হাসিতে বিষাদের কালো মেঘে ছেয়ে গেছে যে মুখটা— তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্যপ্রাচ্যের কালসাপ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।
এভিয়াঁ-লে-বে শহর ছাড়ার আগে জি৭ সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বনেতারা সবাই স্বাগত জানান ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধির সঙ্গে আজ চুক্তিপত্র ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অনিবার্য কারণে তা বাতিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (পাকিস্তান সময়) এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জায়িদি। তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জেনেভায় তার সফর স্থগিত করছেন। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে ডিজিটালভাবে চুক্তিতে সই করায়, সুইজারল্যান্ডে আর কোনো আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে না।’
‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামের ওই চুক্তির স্মারকটি গত রবিবার দুই দেশের মধ্যে প্রথম সই হয় অনলাইনে। সেটা ছিল শুভসূচনা। কথা ছিল শুক্রবারই আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই করবে দুই দেশ। ৩ হাজার ৭০০ ফুট উঁচুতে বসে বুর্গেনস্টকের মেঘ ছুঁইছুঁই পাহাড়ের বিলাসী রেস্টুরেন্টে বসে শান্তির সিলমোহর মারবেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে। পাইক-পেয়াদা-মন্ত্রী-প্রহরীর মহাবহরে ছুটে যাবেন দুই রাষ্ট্রনায়ক। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেদিকেই তাকিয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। কিন্তু ঘটল তার উল্টোটা। বৃহস্পতিবার ভোরে (বাংলাদেশ সময় ৬টা) একপ্রকার সবার অগোচরেই চুক্তিতে সই করেন দুই নেতা। সশরীরে নয়, ডিজিটালি। ফ্রান্সের বিখ্যাত ভার্সাই প্যালেসে। ফরাসি সময়ে তখন বুধবার রাত। জি৭ সম্মেলনস্থল থেকে ফিরে যেন তর সইছিল না ট্রাম্পের।
নৈশভোজের পরেই চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ১৪ দফা চুক্তিতে। ডান পাশে বসেছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো। পেছন থেকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। পরপরই সই করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। তেহরানে বসেই। বৃহস্পতিবার সই করেছেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। এর মাধ্যমেই শেষ হয়ে গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। যা আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল শুরুর কয়েক সপ্তাহ পরেই। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছিল তার লেবানন মিত্র হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। পাল্টা হামলায় কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত, জর্ডান, সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছিল ইরান। অবশেষে তা থামল। শর্ত অনুযায়ী, সইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে গেছে যুদ্ধবিরতি চুক্তি। ১০৭ বছর আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের চুক্তিও সই হয়েছিল রাজা চতুর্দশ লুইয়ের এ ভার্সাই প্যালেসেই।
সইয়ের পর শেষ হুংকার ট্রাম্পের: চুক্তিতে সইয়ের পরেই খুশিতে নিজেই পিঠ চাপড়ান ট্রাম্প। অতি উৎফুল্লে বলে ফেলেন, ‘সব লক্ষ্য পূরণ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, যা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি পেয়েছি আমরা।’ একই সঙ্গে তেহরানকে এক ভয়ংকর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। সাফ জানিয়েছেন, যদি এই ১৪ দফা চুক্তির একটি শর্তও লঙ্ঘন করে ইরান, তাহলে তাদের ওপর আবার ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করা হবে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধ চলাকালে ‘নিরপেক্ষ’ থাকার জন্য চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প।
বেকায়দায় নেতানিয়াহু: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির কারণে রীতিমতো বেকায়দায় পড়েছেন নেতানিয়াহু। ‘বিশ্বাসঘাতক’ বন্ধু ট্রাম্পের ইসরায়েল স্বার্থশূন্য এ চুক্তি রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নেতানিয়াহুর। বহু বছর ধরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে যে ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, তা এক ধাক্কায় নড়বড়ে করে দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন রাজনীতিকদের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তার মতামতের গুরুত্ব আছে বলে দাবি করতেন— তার গুড়ে বালি। ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বা ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তারক্ষক’ হিসেবে নিজের যে দুর্গ তৈরি করেছিলেন, সেটিও এখন বালির বাঁধ।
কী পেল ইরান: চুক্তির ১৪ দফা বিশ্লেষণে লাভের পুরো অঙ্কটাই ইরানের ঘরে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রথম শর্তেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণার মাধ্যমে লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ বাড়বে ইরানের। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি জাহাজের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।
পুনর্বাসনে পাচ্ছে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা। বিদেশে আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ। তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। সবচেয়ে বড় পাওয়াটা হলো বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের শক্তিশালী আত্মপ্রকাশ। এককথায় লাভের গুড়ের ষোলো আনায় ইরানের। আর সব হারাল ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্রের দর্পচূর্ণ: নাটের গুরু ইসরায়েলের শুধু একারই নাক কাটা গেছে তা নয়, দম্ভ ভেঙেছে যুক্তরাষ্ট্রেরও। একবার নয়। পরপর দুবার। প্রথমবার ছিল সহায়ক শক্তি। দূরে থেকে সহায়তা করতে এসেছিল মধ্যপ্রাচ্যের ‘কুসন্তান’কে। ইসরায়েলের ধরাশায়ী দশা দেখে বি-২ বোমারু বিমানে হামলা চালিয়েছিল ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে। গত বছরের কথা। ২০২৫ সালের ১৩ থেকে ২৪ জুন। ১২ দিনের সে যুদ্ধেও ইরানকে ঘায়েল করতে পারেনি দুই মিত্রদেশ। তড়িঘড়ি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে মুখ রক্ষা করতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। পুরাতন সেই বেহাল হাল এবারও। ইরানকে তছনছ করতে এসে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের ঘাঁটিগুলোর লণ্ডভণ্ড দশা দেখতে হয়েছে ওয়াশিংটনকে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মরণক্ষত নিয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে বিশ্বসেরা নৌবহর ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকেও। শেষমেশ পাকিস্তানের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে ঘাড়ত্যাড়া ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য।




