কী পরিমাণ তেল যাচ্ছে হরমুজ দিয়ে?

সংগৃহীত ছবি
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরইমধ্যে এই প্রণালি দিয়ে আসলে কতটা তেল যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি এখনো খোলা আছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারায় প্রতিদিন কয়েক ডজন জাহাজ এই জলপথ পাড়ি দিচ্ছে। এসব জাহাজে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, প্রণালিটি এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের অনুমোদিত জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো জাহাজকে সেখানে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, হরমুজ দিয়ে প্রকৃতপক্ষে কতটা তেল যাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। মার্কিন নৌবাহিনী প্রতিরাতে প্রায় ৩০টি জাহাজকে প্রণালি পার হতে সহায়তা করছে।
ইরান অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটি জানিয়েছে, হরমুজ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে। নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করে অনুমোদিত কিছু জাহাজকে কেবল চলাচলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অন্য কোনো জাহাজ সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে হামলার ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারায় প্রায় ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। তারা এটিকে যুদ্ধ শুরুর পর এক দিনে সর্বোচ্চ জাহাজ চলাচল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও দাবি করেছেন, প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ পার হচ্ছে। সোমবার এই পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল।
এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার ব্র্যাড কুপার দাবি করেছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী সমুদ্রের মাইন সরিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ পরিষ্কার করেছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের সঙ্গে এসব দাবির মিল নেই।
শিপিং তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, গত বুধবার মাত্র ছয়টি জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়েছে। মঙ্গলবার গেছে ১১টি এবং সোমবার পাঁচটি। গত ১০ দিনের গড় হিসাবেও প্রতিদিন প্রায় ১৩টি জাহাজ চলাচল করেছে।
মেরিটাইম ডেটা প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। তাদের হিসাবে, ২৬ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে। তবে কিছু জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা না যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও কিছুটা বেশি হতে পারে।
যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। এসব জাহাজে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। বর্তমানে সেই তুলনায় জাহাজ চলাচল অনেক কম।
ইরানের অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিপরীত। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতেই রয়েছে। নির্ধারিত পথ ও অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তেহরান।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসও দাবি করেছে, অবৈধ পথে চলাচলের সময় দুটি তেলবাহী জাহাজ মাইন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে অচল হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরানের হামলায় একটি সৌদি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ফিলিপিন্সের দুই নাবিক নিহত হয়েছেন।
জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টারও জানিয়েছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। সামান্য বাড়লেও ঝুঁকি এখনো বেশি। বিশেষ করে সমুদ্রে ভাসমান ও শনাক্ত না হওয়া মাইন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক ব্রিজেট ডিয়াকুন জানিয়েছেন, কিছু তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে। কারণ কিছু জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকারী সংকেত বন্ধ করে দেয়। ফলে সেগুলোর চলাচল শনাক্ত করতে সময় লাগে। ১৭ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১৪টি ইরানের সঙ্গে সম্পর্কহীন জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবের এই পার্থক্যের পেছনে জাহাজ গণনার পদ্ধতিও ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে ছোট জাহাজ, টাগবোট, নৌবাহিনীর সহায়ক জাহাজ ও অন্যান্য জলযানও থাকতে পারে। অন্যদিকে লয়েডসের হিসাব মূলত ১০ হাজার ডেডওয়েট টনের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে কেন্দ্র করে।
আরেকটি কারণ হলো, অনেক জাহাজ তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস বন্ধ রেখেছে। ফলে স্যাটেলাইট ও আকাশপথের নজরদারি ছাড়া এসব জাহাজের গতিবিধি জানা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই নিজেদের প্রভাব বেশি দেখাতে চাইছে। ফলে কে কতটা নিয়ন্ত্রণে আছে, তা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি এনশার সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলেছেন, মার্কিন সেন্টকম হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন সরিয়ে ফেলার দাবি করার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার নতুন পর্ব শুরু হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, উত্তেজনা কমাতে দুই পক্ষেরই এ বিষয়ে কম কথা বলা উচিত।
সূত্র: আলজাজিরা







