যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ দিনের রূপরেখায় কী আছে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাত দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি রূপরেখা দিয়েছে ইরান। এমনটাই জানিয়েছে তেহরান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতার দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে।
অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ওয়াশিংটন প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেই সময়সীমা শুরু হতে পারে।
নিউইয়র্কে কাতারের মধ্যস্থতায় চলা পরোক্ষ যোগাযোগকে দুই পক্ষই ইতিবাচকভাবে বর্ণনা করেছে। তবে যুদ্ধ প্রায় সাত মাসে গড়ালেও কোনো পক্ষই কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়নি।
বিশ্লেষকেরা আলজাজিরাকে বলেছেন, স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা এখনো কম। ইরান আগের একটি চুক্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায়। ওই পদ্ধতিতে বৃহত্তর শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনায় ইরান ও ওমানকে প্রধান ভূমিকা দেওয়ার কথা ছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে’ থাকার দাবি করে আসছে এবং তারা শুরুতেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে চায়।
ইরান আগেই স্পষ্ট করেছে, হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং হামলা বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তাসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বৃহত্তর শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে না।
ইরান কী প্রস্তাব দিয়েছে?
নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের আরাঘচি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে।
তিনি বললেন, ‘কিছু শর্ত পূরণ হলে সপ্তম দিনের শেষে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং [শান্তি] আলোচনা আবার শুরু হবে।’
তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে বলেছেন, প্রস্তাবটি ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মতো, যা সংঘাত কিছু সময়ের জন্য কমিয়ে এনেছিল। পরে সেটি ভেঙে যায়।
তার ভাষ্য, ‘তারা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই পরের দিন থেকে সময়সীমা শুরু হতে পারে এবং সাত দিন পর প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে।’
জুনের চুক্তির আওতায় ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো শুল্ক ছাড়াই জাহাজগুলোকে প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শান্তি আলোচনা চালানোর জন্য ওই ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ওই সময় শেষ হওয়ার পর কী হবে, সে বিষয়ে এমওইউতে কিছু নির্দিষ্ট করা হয়নি।
আলজাজিরার গ্যাব্রিয়েল এলিজোন্ডো জানিয়েছেন, নতুন প্রস্তাবটি এমওইউয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও ‘ইরানিরা সময়সীমা কমিয়ে আনছে এবং ধারাবাহিকতাও পরিবর্তন করছে।’
তিনি বললেন, ‘বিষয়টি অনেকটা এমন হবে: লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ ও তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ছেড়ে দেবে। সাত দিন পর হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।’
তবে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো আরবান কানিংহাম আলজাজিরাকে বলেছেন, তেহরান নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
তার ভাষ্য, ‘হরমুজ ইরানের একটি স্পষ্ট রেড লাইন। যুদ্ধের জন্য ইরান ক্ষতিপূরণ পাবে না। তাই অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায় হলো প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ। আমি মনে করি না, তারা এ বিষয়ে পিছু হটবে।’
জুনের চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জুনে স্বাক্ষরিত এমওইউতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। লেবাননে ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির একটি অংশ দখল করে রেখেছে। ওই চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি সমঝোতা নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় এবং প্রণালির মধ্য দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও ছিল।
ইরানের বর্তমান প্রস্তাবের মতো ওই চুক্তিতেও অন্যান্য বিষয় বৃহত্তর শান্তি আলোচনার জন্য পরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে পরের মাসে প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে চুক্তিটি ভেঙে যায়।
কানিংহামের মতে, ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবটি আগের মডেল অনুসরণ করছে: ‘সাত দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দেওয়া, এরপর পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করা।’ তবে ‘যুক্তরাষ্ট্র বিষয়গুলো আলাদা করে আলোচনা করতে চায় না; তারা সবগুলো বিষয়কে একটি প্যাকেজ হিসেবে আলোচনা করতে চায়।’
নতুন প্রস্তাবে ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে?
কানিংহাম মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে যখন জ্বালানির দাম বেশি, তখন জাতিসংঘে প্রকাশ্যে এই প্রস্তাব দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।
তিনি বললেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটিই হয়তো একমাত্র সুযোগ—এ কথা স্পষ্টভাবে বলার মাধ্যমে ইরান তেল ও গ্যাসের দাম এবং প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।’
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই প্রণালি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু ওই অঞ্চলেই নয়, বহুদূর পর্যন্ত জ্বালানির দাম বেড়েছে। ফলে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুই সরকারেরই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চুক্তি হলে ভোটাররা ভোট দেওয়ার আগে ট্রাম্প জ্বালানির দাম কমানোর সুযোগ পেতে পারেন। এতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে।
তবে ট্রাম্প নির্বাচনী হিসাবকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি অভিযোগ করেন, ইরান নভেম্বরের নির্বাচনে তার রিপাবলিকান পার্টি কেমন করে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি পূর্বাভাস দেন, ভোটের পর একটি চুক্তি হবে। চুক্তি না হলে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ারও হুমকি দেন তিনি।
ইরানের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাচন কোনো প্রভাব ফেলছে না দাবি করে ট্রাম্প বললেন, ‘একমাত্র বিষয় হলো, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’
‘হুতিদের লক্ষ্যবস্তু করা মক্কা চুক্তির ইসলামী সংহতির ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক’
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এতে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা কি ইরানের প্রস্তাবিত আলোচনার ধারাবাহিকতা মেনে নিতে তার প্রশাসনকে রাজি করানোর জন্য যথেষ্ট হবে? কানিংহাম তা মনে করেন না।
তিনি বললেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এটি চলতে থাকলেও ট্রাম্প প্রস্তুত আছেন। একই সমস্যা রয়ে গেছে—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্নের উত্তর এই প্রস্তাবে নেই।’
বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা কোন পর্যায়ে?
কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনায় মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই বৈঠককে ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান, দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, বৈঠকটিকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো বুরচু ওজচেলিক আলজাজিরাকে জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বড় বাধা হলো—পরস্পরের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারবে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের ধারণা ভিন্ন।
তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ব্যর্থ হয়ে যাওয়া এমওইউ পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা কম। কারণ, তাদের মূল্যায়ন হলো, নৌ অবরোধ ও আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে।
ওজচেলিক বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, তারা অপেক্ষা করে যেতে পারে, যতক্ষণ না তেহরান অর্থবহ ছাড় দিতে প্রস্তুত হয়। তবে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও ইরান এখনো অনড়।’
সূত্র: আলজাজিরা






