২ হাজার বছরের পুরনো শহরে আজও জীবন্ত রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস

তুরস্কের ইজমির প্রদেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর এফেসাস
তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলের ইজমির প্রদেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর এফেসাস যেন সময়কে উল্টে দেওয়ার এক বিস্ময়। আধুনিক বিশ্বের কোলাহল পেরিয়ে মার্বেল পাথরে মোড়া রাস্তা, সু-উচ্চ স্তম্ভ আর শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্যের সামনে দাঁড়ালেই মনে হবে যেন দুই হাজার বছর আগের রোমান সাম্রাজ্যে ফিরে গিয়েছেন। আর সেই কারণেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এই শহর।
খ্রিস্টপূর্ব দশম শতকে প্রতিষ্ঠিত এফেসাসের আয়তন প্রায় ১৬০০ একর। যা ডিজনিল্যান্ডের প্রায় দশ গুণ বড়। ২০২৫ সালে প্রায় ২৫ লক্ষ পর্যটক এই ঐতিহাসিক নগরী দেখতে গিয়েছিলেন। একসময় এজিয়ান উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী হিসেবে এফেসাস ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যের কেন্দ্র। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট থেকে শুরু করে মার্ক অ্যন্টনি এবং ক্লিওপেট্রার মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বও এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।
শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল মার্বেল পাথরে মোড়ানো কিউরেটিস স্ট্রিট। একসময় এই রাস্তার দুধারে রেশম ও সুগন্ধির দোকান এবং ছায়া দেওয়া সারিবদ্ধ গাছ ছিল। রাতে আলো জ্বালানোর জন্য দেয়ালে বিশেষ বাতিরও ব্যবস্থা ছিল। আর বর্তমানে গ্রীষ্মকালে রাতের বিশেষ ভ্রমণেরও আয়োজন করা হচ্ছে। যাতে পর্যটকেরা এই প্রাচীন শহরের আবহ আরও কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন।
এফেসাসের জনপ্রিয় স্থাপনা নিঃসন্দেহে সেলসাস লাইব্রেরি। দ্বিতীয় শতকে নির্মিত এই বিশালাকার গ্রন্থাগারে একসময় ১২ হাজারেরও বেশি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। ২৬২ খ্রিস্টাব্দে আগুনে গ্রন্থাগারের ভেতরের অংশ ধ্বংস হয়। অবশ্য আজও তার বিশাল সম্মুখভাগ দর্শকদের মুগ্ধ করে। আবার এই স্থাপনাটি একই সঙ্গে রোমান সেনেটর গাইয়ুস জুলিয়াস সেলসাস পোলেমেয়ানুসের সমাধিও। তবে এফেসাস শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই ছিল না, লাইব্রেরির ঠিক বিপরীত দিকেই ছিল একটি পতিতালয়। রাস্তার ওপর খোদাই করা পায়ের ছাপ, টাকার থলি ও নারীর প্রতীককে বিশ্বের প্রাচীনতম বিজ্ঞাপনগুলির একটি বলে মনে করেন ঐতিহাসিকরা। এছাড়াও শহরের জনসাধারণের শৌচাগার, বিশাল রোমান স্নানাগার এবং অভিজাতদের টেরেস হাউস প্রমাণ করে যে নগর পরিকল্পনা ও প্রকৌশলে রোমানরা কতটা উন্নত ছিল।
এফেসাস ছিল ধর্মীয়ভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। কারণ এখানেই ছিল বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের অন্যতম আর্টেমিস মন্দির। যদিও এখন সেই বিশাল মন্দিরের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র পুনর্নির্মিত স্তম্ভ। পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টধর্মেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয় এ শহর। মনে করা হয় সেন্ট পল এখানে কয়েক বছর ধর্মপ্রচার করেছিলেন। ২৫ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার গ্রেট থিয়েটার, গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধক্ষেত্র, রাজনীতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের স্মৃতি সব মিলিয়ে এফেসাস আজও রোমান সভ্যতার এক চিরন্তন দলিল।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন




