ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী, তাতে ইরানের কী সুবিধা

ইরাক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে যাচ্ছেন সেনাসদস্যদের একাংশ। ফাইল ছবি / রয়টার্স
দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরাকে থাকা মার্কিন সেনারা এবার পুরোপুরি সরে যাচ্ছে। বুধবারের মধ্যে দেশটির শেষ মার্কিন ঘাঁটিগুলোও খালি করার কথা। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের মধ্য দিয়ে যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির শুরু হয়েছিল, তারই সমাপ্তি ঘটছে এই প্রত্যাহারের মাধ্যমে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অবশ্য হঠাৎ নেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইরাকের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা করেছিল। সেই সিদ্ধান্তই এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বাস্তবায়ন করছে। তবে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত। একই সময়ে ইরাকে ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবও শক্তিশালী।
ফলে মার্কিন সেনা সরে যাওয়াকে শুধু একটি সামরিক প্রত্যাহার হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এটি ইরাকের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
কেন ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ইরাক এমন একটি দেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান— দুই দেশেরই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব রয়েছে। গত কয়েক বছরে ইরাক অনেকটা দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলেছে। মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি ইরানের প্রভাবের ওপর এক ধরনের সামরিক ভারসাম্য তৈরি করেছিল বলে মনে করেন কিছু ইরাকি বিশ্লেষক।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের চলে যাওয়া ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। তার মতে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ইরাকের ওপর তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে একটি ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে।
এখন সেই ভারসাম্য কমে গেলে ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এর মধ্যে মার্কিন প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি এটিকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি নির্ধারিত সামরিক রূপান্তর হলেও তেহরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর কাছে এর রাজনৈতিক অর্থ অনেক বড়।
ইরাক কি নিজের নিরাপত্তা সামলাতে প্রস্তুত
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইরাকে মার্কিন সেনা থাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
অনেক ইরাকি মনে করেন, দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বিদেশি সেনাদের চলে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে নিরাপত্তা কাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ আছে।
ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেছেন, সব ইরাকিই পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চান। কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট এভাবে চলে গেলে যে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই অনেকের আশঙ্কা।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই ইরাকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিদেশি সেনার উপস্থিতি কমছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের ভেতরেই এমন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি এরই মধ্যে ইরানঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াগুলোকে অস্ত্র রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠী সেই আহ্বান মানতে রাজি নয়। ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে এসব গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাস
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ইতিহাস দুই দশকেরও বেশি পুরনো।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত করতে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর দেশটিতে মার্কিন দখলদারিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহবিরোধী অভিযান চলে। ২০১১ সালের শেষে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু করা হয়।
কিন্তু তিন বছরেরও কম সময় পর তাদের আবার ইরাকে ফিরতে হয়। কারণ ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আবার দেশটিতে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলে।
২০১৭ সালের মধ্যে ইরাকে আইএসের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু গোষ্ঠীটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। তাদের গোপন সেল এখনো বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় বলে ইরাকি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।
আইএস কি আবার সুযোগ পাবে
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দ্বিতীয় বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এটিই।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, সরবরাহ সহায়তা ও ড্রোনের ব্যবহার কমে গেলে আইএসের গোপন সেলগুলো আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তার দাবি, আন্তর্জাতিক জোটের প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর গত দুই সপ্তাহে আইএসের গোপন সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তার মতে, এতে গোষ্ঠীটির সদস্যদের মনোবলও বেড়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী আরও জানিয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় আত্মঘাতী হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল। কয়েকজন ইরাকি নিরাপত্তা ও সেনা কর্মকর্তার মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে সামরিকভাবে বড় ধরনের পরাজয়ের পরও আইএস নিরাপত্তার ফাঁক কাজে লাগানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
অর্থাৎ, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর ইরাকের সামনে শুধু ইরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কাই নেই। আইএসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীও নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
ইরাক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইরাকের গুরুত্ব শুধু দেশটির ভেতরের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এই দেশ।
ইরাক একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে দুই দেশের বিরোধ অনেক সময় ইরাকের মাটিতেই প্রকাশ পেয়েছে।
২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। এর পর ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে একাধিক হামলা চালিয়েছে। কখনো এসব হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধেও ইরাক সেই সংঘাতের বাইরে থাকতে পারেনি। এ বছর নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে মারা গেছেন। সর্বশেষ জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় এক মার্কিন সেনা নিহত হন।
সামনে কী হতে পারে
মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর ইরাককে একসঙ্গে কয়েকটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
প্রথমত, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, আইএস যেন নিরাপত্তার ফাঁক কাজে লাগাতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে ইরানের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়ায় তেহরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ কমছে। কিন্তু সেই সুযোগ কতটা রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে ইরাকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে তার ওপর।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইরাক থেকে সরে যাওয়া মানেই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সামরিক উপস্থিতির বদলে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক ধরে রাখার সুযোগ থাকবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ‘মার্কিন সেনা থাকবে কি না’— এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর ইরাকের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ কতটা বাগদাদের হাতে থাকে। সেই উত্তরই ঠিক করবে এই প্রত্যাহার ইরাকের জন্য পূর্ণ সার্বভৌমত্বের নতুন অধ্যায় হবে, নাকি নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সূচনা।
সূত্র : রয়টার্স







