ইরানে ট্রাম্পের থেমে থেমে হামলার পরিকল্পনা কাজ করবে?

তেহরানের রাস্তায় আমেরিকার পতনের গ্রাফিতি। ছবি: রয়টার্স
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়েছে। এর মধ্যেই যুদ্ধের ধরন বদলানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এক মাসের বেশি সময় পর চলতি সপ্তাহে সোমবার আবার সরাসরি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও পাল্টা হামলা করেছে।
সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা ইরানে কঠোরভাবে আঘাত করব... এর জবাব দেওয়া হবে।’
তার এ বক্তব্যের পরই নতুন প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র কি আবার দীর্ঘ যুদ্ধের পথে যাচ্ছে? নাকি এটি ইরানকে মাঝে মাঝে আঘাত করে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’— এমন একটি কৌশল বিবেচনা করছে। অর্থাৎ, নিয়মিত বিরতিতে ইরানে হামলা চালানো হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াবে না যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু এ কৌশল কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কী ঘটেছে সোমবার
সোমবার হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে কাছের ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দ্বীপটি কৌশলগত বন্দর আব্বাসের একদম নিকটে।
ওয়াশিংটনের দাবি, আইআরজিসি সেখানে দুটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা প্রস্তুত করছিল। এগুলো দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
ওই হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন বলে ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এর জবাবে, জর্ডানে মার্কিন সেনা ও সরঞ্জাম থাকা দুটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। জর্ডান জানিয়েছে, তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
এরপরই পাল্টা জবাবের হুমকি দেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করব’।
তবে ট্রাম্প এটিও বলেছেন, নতুন করে সংঘর্ষ মানেই আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হচ্ছে না। তার দাবি, হরমুজ প্রণালি এখন ‘অত্যন্ত ভালো অবস্থায়’ রয়েছে। ইরানের অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও নেতৃত্বও অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
যুদ্ধের কৌশল বারবার বদলেছেন ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল এক জায়গায় থাকেনি।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হয়েছিল বড় ধরনের সামরিক অভিযান দিয়ে। সেই অভিযান চলে একটানা ৪০ দিন। এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। পরে তা কাতারের সমঝোতায় আরও বাড়ানো হয়।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। এতে যুদ্ধবিরতি, বৃহত্তর শান্তি আলোচনা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ খোলার কথা ছিল। হরমুজ প্রণালিও খুলে দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সমঝোতার ভাষা ছিল অস্পষ্ট। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। দুই দেশই একে অপরকে চুক্তি ভাঙার জন্য দায়ী করে।
এরপর জুলাইয়ে আবার ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোয় থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা চালায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা থেকে কিছুটা সরে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়।
অস্ত্র কমে আসা নিয়েও সন্দেহ আছে
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অস্ত্রের মজুদ কমে আসছে। বিশেষ করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন অস্ত্র ফুরিয়ে আসার কথা অস্বীকার করেছে।
এর মধ্যেই গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন।
ইরানের তেলসহ বিভিন্ন আয়ের উৎসকে লক্ষ্য করার কথা জানায় ওয়াশিংটন। ইরানের তেল বিক্রিতে সহায়তা করছে— এমন ৬০টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়।
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্য দেশ ও কোম্পানির বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের সামরিক পাল্টা হামলাই প্রমাণ করে অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়ে তেহরান ‘সহিংসভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে’।
তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে— এমন দাবি ‘ভুল’। ‘আমাদের পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে’—বলেছেন তিনি।
‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’— এটা কি যুদ্ধের নতুন পথ
বর্তমান পরিস্থিতি যেন যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এক অদ্ভূত অবস্থান। কেউই এখনই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরতে চাইছে না। আবার কেউই পিছু হটতেও রাজি নয়।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানকে মাঝে মাঝে হামলা করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে ট্রাম্প এখনো এই পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি।
যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের শুরুতে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপর থেকে স্বাভাবিক নৌ চলাচল আর ফিরতে পারেনি।
কখনো ইরান নিজেদের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ মনে করা কয়েকটি জাহাজকে পার হতে দিয়েছে। আবার অনুমতি ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করা জাহাজে রকেট ছুড়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন, মার্কিন নৌবাহিনী সফলভাবে জাহাজগুলোকে পাহারা দিচ্ছে।
কিন্তু কূটনৈতিক পথ এখন অনেকটাই বন্ধ।
জুনের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর ইরান বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তারা আর আলোচনা করতে চায় না। হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি মনে করেন, ইরানকে বারবার বোমা মারা মানে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়া।
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা থেকে সরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
এটি হবে বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ যুদ্ধ শুরুর সময় ওয়াশিংটন ভেবেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘাত শেষ হয়ে যাবে।
এই কৌশল কতটা টিকবে
ইরানের ওপর নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি মনে করেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের বড় লক্ষ্য।
যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। এখন সেটিই সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এসলামির মতে, ওয়াশিংটনের ভুল হিসাব থেকেই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখনো যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী।
তার আশঙ্কা, মাঝেমধ্যে হামলা চালানোর কৌশল উত্তেজনা আরও বাড়াবে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মরতেজাভিও মনে করেন, জুনের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা বাড়া প্রায় অনিবার্য ছিল।
তিনি বলেছেন, ইরানের অবস্থান পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় ফিরলে ইরানও ফিরবে। আর ওয়াশিংটন সামরিক চাপ চালিয়ে গেলে ইরানও পাল্টা চাপ বাড়াবে।
তার মতে, দুপক্ষের আবার সমঝোতায় ফেরাই উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে পরিষ্কার পথ।
তা না হলে পরিস্থিতি দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এসলামি আরও বলেছেন, ইরান হরমুজের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনই কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন মনে করছে না।
তার ধারণা, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু এরই মধ্যে হরমুজে জাহাজ চলাচল তলানিতে নেমেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জাহাজ চলাচল করলেও এখন দৈনিক গড়ে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করছে।
মরতেজাভির মতে, অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তেহরানকে আত্মসমর্পণ করানো যাবে না। দুই পক্ষই হয়তো মনে করছে তারা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু প্রতিটি নতুন সংঘর্ষ বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এর সঙ্গে আছে অস্ত্রের প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র কতদিন পরপর ইরানে হামলা চালাতে পারবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বড় চাপ
যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। সবশেষ ইপসোস পরিচালিত রয়টার্সের জরিপে দেখা গেছে, দেশের ভেতরে তার জনপ্রিয়তার হার কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে কম।
এ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ছে। যুদ্ধও দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে দেশের ভেতরেই ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া রাজনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ইসরায়েলের সঙ্গে কী দূরত্ব বাড়ছে
এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে। কিন্তু এখন দুই মিত্রের অগ্রাধিকার এক নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মাসেও বলেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
তবে ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন প্রমাণ নেই।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ইরানে সরাসরি একবার হামলা চালিয়েছে। জুনের সমঝোতাও ইসরায়েল বাধাগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সমঝোতা অনুযায়ী সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। একই সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ কমানো।
কারণ সামনে নভেম্বরের নির্বাচন।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পার্সির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ এখন আর পুরোপুরি এক নয়।
তার ভাষায়, ইরানের সঙ্গে অনন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কোনো স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তার ওপর আরব মিত্রগুলো সমাঝোতার চাপ দিচ্ছে।
অন্যদিকে, তেলআবিব নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিবে না।
সূত্র: আলজাজিরা







