একসময় বিদেশিদের স্বর্গ ছিল যে সৈকত

গোয়া-তে কোভিড-পূর্ব সময়ের তুলনায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে—সংগৃহীত
দুপুরের রোদ তখন প্রায় আগুনের মতো। ভারতের গোয়া রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তের পালোলেম সৈকতে দাঁড়ালে মনে হয়, সূর্য যেন ঝুলছে ঠিক মাথার ওপর। তবু সৈকতে মানুষের ভিড় কম নয়। কেউ সমুদ্রের ঢেউয়ে গা ভাসাচ্ছে, কেউ বালুর ওপর শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে। আবার কেউ সৈকতঘেঁষা কাঠের ছোট্ট শ্যাকে বসে ঠান্ডা পানিতে হাত দিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
দূর থেকে দেখলে সবকিছুই যেন আগের মতো। সমুদ্র আছে, গান আছে এবং আছে রাতভর আলো। তবু কোথাও যেন কিছু একটা বদলে গেছে। একসময় এই সৈকতে ইউরোপীয় আর রুশ পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত। এখন সেই বিদেশিরা যেন ধীরে ধীরে যাচ্ছে হারিয়ে। সৈকতে এখন ভিড় মূলত দেশীয় পর্যটকদের। গোয়ার বাতাসে আজও উৎসবের আমেজ আছে, কিন্তু আগের সেই আন্তর্জাতিক কোলাহল যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
একসময় এই সৈকতগুলোতে ইউরোপীয় আর রুশ পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত। ষাট ও সত্তরের দশকে হিপ্পিদের হাত ধরে বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল গোয়া। সস্তা খাবার, সমুদ্রের ধারে নিরুদ্বেগ জীবন, রাতভর পার্টি আর ধীরগতির জীবনযাপন—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছিল বিদেশি ব্যাকপ্যাকারদের স্বপ্নের জায়গা। কিন্তু এখন সেই বিদেশিরা যেন ধীরে ধীরে যাচ্ছে হারিয়ে। সৈকতে ভিড় আছে ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগই ভারতীয় পর্যটক।
গোয়ার পর্যটন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে প্রায় ৯ লাখ বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন গোয়ায়। অথচ ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় পাঁচ লাখে। অন্যদিকে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে দ্রুত। ২০১৬ সালে যেখানে দেশীয় পর্যটক ছিল প্রায় ৬৮ লাখ। সেখানে গত বছর তা এক কোটির সীমা ছাড়িয়েছে।
পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সৈকতের ধারে বসলে। রাশিয়ার ব্যালে নৃত্যশিল্পী সোফি পঞ্চমবারের মতো গোয়ায় এসেছেন। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আগে এখানে এলে চারপাশে শুধু বিদেশিদেরই দেখা যেত। এখন সেটা আর নেই।’
তার মতে, ‘এর পেছনে বড় কারণ অর্থনৈতিক চাপ। কোভিড গেল, তারপর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে এখন বিমানের টিকিটও অনেক দামি। মানুষের হাতে আগের মতো টাকা নেই।’
সোফির অনেক বন্ধুই এবার গোয়ার বদলে তুরস্ক বা মিসরে ছুটি কাটাতে গেছেন। কারণ সেগুলো ইউরোপের কাছাকাছি, খরচও কম। ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল থেকে আসা রিকোর গল্পও প্রায় একই।
গত ২০ বছর ধরে তিনি নিয়মিত গোয়ায় আসছেন। কিন্তু এবার এসে তার মনে হয়েছে, গোয়া যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
আজকের পর্যটকেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চান। তারা শেষ মুহূর্তে ট্রিপ পরিকল্পনা করেন। কিন্তু দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া তাদের নিরুৎসাহিত করছে
‘ইউরোপের অনেক মানুষ এখন বিদেশ কম যাচ্ছে। তারা নিজেদের দেশেই বেশি ছুটি কাটাচ্ছে’—বলছিলেন তিনি।
তবে শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, বিদেশিদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ জমেছে।
বিদেশি পর্যটকদের অভিযোগ, ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া আগের চেয়ে জটিল হয়েছে। পাঁচ বছরের ভিসা ফিও বেড়েছে। ফলে অনেক পর্যটক হঠাৎ পরিকল্পনা করে গোয়ায় আসতে পারছেন না।
গোয়ার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আর্নেস্ট ডায়াস বলছিলেন, ‘আজকের পর্যটকেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চান। তারা শেষ মুহূর্তে ট্রিপ পরিকল্পনা করেন। কিন্তু দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া তাদের নিরুৎসাহিত করছে।’
তিনি বলেছিলেন, ‘সম্প্রতি একটি বড় রুশ পর্যটক দল গোয়া সফর বাতিল করে ভিয়েতনাম চলে গেছে। কারণ সেখানে অন-অ্যারাইভাল ভিসা সহজ, খরচও কম। আসলে এশিয়ার পর্যটন বাজারে এখন প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেশি।’
একসময় গোয়ার সমুদ্র, স্বাধীন জীবন আর সস্তা রিসোর্ট বিদেশিদের কাছে আলাদা আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এখন ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা কিংবা থাইল্যান্ড আরও কম খরচে একই ধরনের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। বরং অনেকের মতে, সেই দেশগুলো আরও পরিষ্কার আরও পর্যটকবান্ধব।
বিদেশিরা পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খুব সচেতন। সৈকতের পথে আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখলে সেটা তাদের কাছে খারাপ বার্তা দেয়
বেনাউলিম বিচের পাশে এক সৈকত রেস্তোরাঁয় বসে বিবিসির সঙ্গে কথা বলছিলেন, ‘নিকোলা নামের এক ব্রিটিশ নারী। বন্ধুদের সঙ্গে তিন সপ্তাহের জন্য গোয়ায় এসেছেন।
‘আগে লন্ডন থেকে সরাসরি ফ্লাইট ছিল। এবার মুম্বাইয়ে যাত্রাবিরতি করতে হয়েছে। পুরো যাত্রাটাই হয়ে গেছে বিরক্তিকর।’—বলছিলেন তিনি।
নিকোলার ভাই এবার গোয়ার বদলে শ্রীলঙ্কা গেছেন। কারণ তার মনে হয়েছে, শ্রীলঙ্কা এখন আরও সস্তা আরও পরিষ্কার এবং পর্যটকদের জন্য বেশি আরামদায়ক। পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি এখন গোয়ার জন্য বড় এক সংকট।
সৈকতগুলো পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করা হলেও অনেক রাস্তা এখনো আবর্জনায় ভরা। বিদেশি পর্যটকদের চোখে এটি খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আর্নেস্ট ডায়াস স্বীকার করছিলেন, ‘বিদেশিরা পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খুব সচেতন। সৈকতের পথে আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখলে সেটা তাদের কাছে খারাপ বার্তা দেয়।’
তার ওপর রয়েছে ট্যাক্সি সমস্যা। স্থানীয় ইউনিয়নের বিরোধিতার কারণে অ্যাপভিত্তিক গাড়ি সেবা ঠিকভাবে চালু হয়নি। ফলে অনেক পর্যটক অভিযোগ করেন, গোয়ায় ট্যাক্সি ভাড়া অস্বাভাবিক বেশি।
ডায়াস বলছিলেন, ‘মনে হয় যেন এখনো প্রস্তর যুগে আছি। মোবাইল অ্যাপে সহজে ট্যাক্সি পাওয়া যায় না। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসাতেও।’
শেরভিন লোবো নামের এক হোটেল মালিক জানিয়েছেন, তার হোটেলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা অন্তত ১০ শতাংশ কমেছে। যদিও দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, তবু বিদেশি পর্যটকদেরই তারা বেশি পছন্দ করেন।
কারণ বিদেশিরা সাধারণত বেশি দিন থাকেন। স্থানীয় দোকান, রেস্তোরাঁ, মোটরবাইক ভাড়া—সবখানেই বেশি খরচ করেন।
অন্যদিকে ভারতীয় পর্যটকদের বড় একটি অংশ প্যাকেজভিত্তিক ভ্রমণে আসেন। ফলে স্থানীয় ছোট ব্যবসাগুলো বিদেশিদের মতো লাভ পায় না। তবু গোয়া হার মানতে রাজি নয়।
সরকার এখন নতুন করে বিদেশি পর্যটক ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দেশে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পোল্যান্ডে রোডশো করা হয়েছে। এবার লক্ষ্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলো। একই সঙ্গে এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন পর্যটকদের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গোয়াকে এখন নতুন করে লড়তে হচ্ছে।
কারণ একসময় যে সমুদ্রতীর শুধু নামের জোরেই বিদেশিদের টেনে আনত। এখন সেই জায়গাকেই আবার প্রমাণ করতে হচ্ছে—কেন মানুষ এখানে আসবে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে পালোলেম সৈকত-এ। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে লাল হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের জলে। সৈকতের ধারে গান বাজছে, আলো জ্বলছে, মানুষ নাচছে। সবকিছু যেন আগের মতোই। তবু কোথাও একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। কারণ গোয়ার বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় সেই বিদেশি ব্যাকপ্যাকারদের স্মৃতি। যারা একসময় এই সমুদ্রতীরকে নিজেদের দ্বিতীয় বাড়ি বানিয়েছিল।









