পুলিশ কামড় মামলায় দোষী, অথচ দাঁত ছিল অন্য কারও

সংগৃহীত ছবি
ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের একটি শান্ত কবরস্থানে দাঁড়ালে চোখ আটকে যাবে একটি অদ্ভুত লেখায়। চারপাশে নিস্তব্ধতা, পুরনো গাছের ছায়া আর সারি সারি কবরের মাঝখানে একটি কবরফলকে খোদাই করা আছে কয়েকটি অবিশ্বাস্য শব্দ। ‘ব্রিটিশ আইনের ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি, যিনি অন্য কারও দাঁত দিয়ে একজন পুলিশ সদস্যকে কামড়ানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।’
প্রথম শুনলে বিষয়টি কৌতুক মনে হতে পারে। কেউ হয়তো হেসেও ফেলবে। কিন্তু এই কয়েকটি শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মানুষের দীর্ঘ কষ্ট, অপমান আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প।
সেই মানুষটির নাম অ্যালিস্টার মিচেল। তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রা প্রেস্টন একবার বলেছিলেন, ‘তাকে পুলিশকে কামড়ানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। অথচ সে আসলে কাউকে কামড়ায়ইনি।’
গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে। সেসময় ব্রিটেনে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ‘পোল ট্যাক্স’ বা কমিউনিটি চার্জকে ঘিরে। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। লন্ডনের রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিক্ষোভে। একসময় পরিস্থিতি ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নেয়। চারপাশে ভাঙচুর, ধাওয়া, পুলিশের লাঠিচার্জ— পুরো শহর যেন বিশৃঙ্খলায় ডুবে যায়।
সেদিন সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ছিলেন অ্যালিস্টার মিচেল। তিনি কোনো দাঙ্গাবাজ ছিলেন না। কিন্তু ঘটনাচক্রে ভিড়ের মধ্যে আটকা পড়ে যান। পরে তিনি বলেছিলেন, চারপাশে তখন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল। হঠাৎ তিনি দেখেন, কয়েকজন পুলিশ একজন তরুণকে ঘিরে রেখেছে। তাদের একজনের হাত ছেলেটির থুতনির নিচে শক্তভাবে চেপে ছিল। দৃশ্যটি দেখে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, এভাবে করবেন না, এতে ছেলেটা মারা যেতে পারে।
সে চেয়েছিল অন্য কেউ যেন এমন অন্যায়ের শিকার না হয়।’ কবরফলকে আরও একটি লেখা আছে। সেটি লিখেছিলেন মিচেলের বাবা, কবি অ্যাড্রিয়ান মিচেল ‘আমার মস্তিষ্ক সমাজতান্ত্রিক, হৃদয় নৈরাজ্যবাদী, চোখ শান্তিবাদী, আর রক্ত বিপ্লবী
এই একটি বাক্যই বদলে দেয় তার জীবন। তিনি দেখেন, কয়েকজন পুলিশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তিনি পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছেন এবং এক পুলিশ সদস্যকে কামড়েছেন।
মিচেল পরে বলেছিলেন, ‘পরদিন সকালে আমার মনেই হয়নি যে আমি কোনো পুলিশকে কামড়েছি। আমার দাঁত কখনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তার হাতের কাছেও গিয়েছিল বলে মনে পড়েনি।’ তার আইনজীবীরা পরে কামড়ের দাগ পরীক্ষা করে দেখেন। মিচেলের দাঁতের ছাঁচের সঙ্গে সেই ক্ষতচিহ্নের কোনো মিলই ছিল না। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, কামড়টি অন্য কারও।
তবুও আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। সেই রায় শুধু তাকে কারাগারে পাঠায়নি, ভেঙে দিয়েছিল তার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দও। কয়েক সপ্তাহ জেলে কাটাতে হয়েছিল তাকে। বাইরে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। পরিচিত মানুষদের চোখে তিনি হয়ে উঠছিলেন একজন অপরাধী। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল ভেতরের যন্ত্রণা। কারণ তিনি জানতেন, তিনি নির্দোষ।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। চার বছর ধরে আদালতের পেছনে ছুটতে হয় তাকে। প্রতিটি শুনানি, প্রতিটি তারিখ যেন তাকে আরও ক্লান্ত করে তুলছিল। তবুও তিনি থামেননি। অবশেষে বিচারিক পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে তার দণ্ড বাতিল করা হয়। আদালত স্বীকার করে, সেই রায়ে ভুল ছিল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
হাসপাতালে থাকার সময় তিনি পুরো নার্সিং টিমের জন্য কৌতুকশিল্পী স্টুয়ার্ট লি এর শোয়ের ৩০টি টিকিট কিনে দিয়েছিলেন। কারণ তার মনে হয়েছিল, ওদের একটু হাসা দরকার
মিচেল পরে বলেছিলেন, ‘ন্যায়বিচার পেতে অনেক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।’
ঘটনাটি সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দেয়। ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী প্রাইভেট আই ঘটনাটি নিয়ে রসিকতা করেছিল। সেখানকার সাংবাদিক পল ফুট-ই প্রথম বলেছিলেন সেই বিখ্যাত লাইন— ‘অন্যের দাঁত দিয়ে পুলিশকে কামড়ানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া একমাত্র ব্যক্তি।’
পরে সেই কথাটিই জায়গা পায় মিচেলের কবরফলকে। তবে এই ঘটনা তাকে শুধু কষ্ট দেয়নি, বদলে দিয়েছিল তার জীবনও। চার বছর আদালতে ঘুরতে ঘুরতে তিনি বুঝেছিলেন, একজন নির্দোষ মানুষের পাশে ভালো আইনজীবী থাকা কত জরুরি। সেখান থেকেই নতুন সিদ্ধান্ত। তিনি নিজেই আইন পড়তে শুরু করেন। পরে ব্যারিস্টার হন। জীবনের বাকি সময় অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত মানুষদের পক্ষে দাঁড়াতেন।
তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রা বলেছিলেন, ‘সে চেয়েছিল অন্য কেউ যেন এমন অন্যায়ের শিকার না হয়।’ কবরফলকে আরও একটি লেখা আছে। সেটি লিখেছিলেন মিচেলের বাবা, কবি অ্যাড্রিয়ান মিচেল ‘আমার মস্তিষ্ক সমাজতান্ত্রিক, হৃদয় নৈরাজ্যবাদী, চোখ শান্তিবাদী, আর রক্ত বিপ্লবী।’
হয়তো সেই বিদ্রোহী রক্তই তাকে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে শিখিয়েছিল। ২০১২ সালে তার শরীরে ধরা পড়ে দুরারোগ্য রক্তের ক্যানসার। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৯ সালে, ৬১ বছর বয়সে তিনি মারা যান। কিন্তু মৃত্যুর কাছাকাছি সময়েও মানুষকে হাসানোর চেষ্টা থামাননি। তার স্ত্রী স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, হাসপাতালে থাকার সময় তিনি পুরো নার্সিং টিমের জন্য কৌতুকশিল্পী স্টুয়ার্ট লি এর শোয়ের ৩০টি টিকিট কিনে দিয়েছিলেন। কারণ তার মনে হয়েছিল, ‘ওদের একটু হাসা দরকার।’
আজ সেই মানুষটি নেই। কিন্তু শ্রপশায়ারের সেই কবরফলকে এখনো বেঁচে আছে এক ভুল রায়ের দাগ। বেঁচে আছে এমন এক মানুষের স্মৃতি, যিনি অন্যায়ের কাছে হার মানেননি।






