ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত
রাতের আকাশে রহস্যময় ‘চাঁদের রংধনু’

সংগৃহীত ছবি
রাত তখন ধীরে ধীরে আরও গভীর হচ্ছিল। চারপাশে এমন এক অন্ধকার নেমে এসেছিল, যেন পৃথিবীর সব আলো কেউ নিভিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেও একটা শব্দ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল দূরের কোনো ঝড়ের গর্জন। পরে বুঝলাম, সেটা বাতাস নয়, পানি। অসংখ্য টন পানি একসঙ্গে নিচে আছড়ে পড়ার শব্দ।
পথটা যত সামনে এগোচ্ছিল, শব্দটাও তত ভয়ংকর হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, মাটির ভেতর দিয়েও সেই গর্জন শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর জলপ্রপাতগুলোর একটি। স্থানীয়দের ভাষায় যার নাম ‘মোসি-ওয়া-তুনিয়া’ অর্থাৎ ‘গর্জন করা ধোঁয়া’। দিনের বেলায় এখানে হাজারো পর্যটক আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন, কেউ আবার শুধু প্রকৃতির শক্তি অনুভব করেন। কিন্তু রাতের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেখানে কোনো কৃত্রিম আলো নেই। নেই শহরের কোলাহল। শুধু পূর্ণিমার নরম আলো আর অসীম অন্ধকারের ভেতর জলধারার উন্মত্ত গর্জন। শত মিটারেরও বেশি ওপরে থেকে নিচে ধেয়ে পড়া পানির সাদা রেখাগুলো দূর থেকে ঠিক বোঝাও যায় না। শুধু দেখা যায়, বাতাসে ভেসে থাকা অসংখ্য পানির কণা। যেন জল নয়, আকাশের ভেতর ভাসছে ধোঁয়া। সেই রাতের অভিজ্ঞতাটা আসলে পরিকল্পিত ছিল না।
ঘণ্টাখানেক আগেও আমি ছিলাম দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত। পাঁচ সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একা গাড়ি চালিয়ে ঘুরছিলাম। সীমান্ত পার হওয়ার ঝামেলা পেরিয়ে বতসোয়ানা থেকে জাম্বিয়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে শরীর-মন দুটিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। লিভিংস্টোন শহরে পৌঁছে তখন শুধু একটা জিনিসই মাথায় ছিল— যেভাবেই হোক জলপ্রপাতটা দেখতে হবে।
পার্কের গেটে দুপুরে টিকিট কাটতে গেলে একজন পার্কিং অ্যাটেনডেন্ট হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাতে আবার ফিরবেন?’ অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইতেই তিনি বললেন, ‘আজ পূর্ণিমা। ভাগ্য ভালো থাকলে আজ রাতে মুনবো দেখা যেতে পারে।’
মুনবো হচ্ছে চাঁদের আলোয় তৈরি রংধনু। আমি আগে নামটা শুনেছিলাম, কিন্তু কখনো ভাবিনি জীবনে সত্যিই দেখার সুযোগ হবে। তাই আর দেরি না করে দুটি টিকিট কিনলাম। একটি দিনের জন্য, আরেকটি রাতের জন্য।
বিকেলে জলপ্রপাতের পাশের সরু ‘নাইফ-এজ ব্রিজ’ পার হওয়ার সময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো শরীর ভিজে গেল। বাতাস যেন পানি হয়ে গিয়েছিল। একেকটা দমকা হাওয়ার সঙ্গে এসে লাগছিল ভারী পানির ফোঁটা। কাপড়, জুতা, ব্যাগ— সব ভিজে একাকার।
প্রতিটি ভিউপয়েন্টে জলপ্রপাতকে নতুনভাবে দেখা যাচ্ছিল। কোথাও শুধু সাদা কুয়াশা, কোথাও গভীর খাদ, কোথাও আবার একটানা সাদা পানির দেয়াল। শেষ প্রান্তে গিয়ে যখন পুরো জলপ্রপাতটা চোখের সামনে ধরা দিল, মনে হলো যেন পৃথিবীর কিনারা ভেঙে পানি নিচে পড়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা নামার পর আবার ফিরে এলাম। তখন চারপাশে মানুষের সংখ্যা খুব কম। অন্ধকার পথ ধরে সবাই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। কেউ কথা বলছিল না খুব একটা। সবাই যেন অপেক্ষা করছিল কোনো অলৌকিক ঘটনার।
রাত ৮টার দিকে ছোট্ট একটা দল দাঁড়িয়ে ছিল কুয়াশার সামনে। সবাই আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল। পূর্ণিমার চাঁদ ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। কিন্তু মুনবো তখনো দেখা যায়নি। মাঝেমধ্যে কেউ হঠাৎ বলে উঠছিল, ‘ওই যে!’ সবাই তাকাচ্ছিল; কিন্তু মুহূর্তেই সেটি মিলিয়ে যাচ্ছিল। অপেক্ষা যেন আরও দীর্ঘ হচ্ছিল।
তারপর হঠাৎ করেই খুব ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর এক ফ্যাকাশে আলোর রেখা ফুটে উঠল। প্রথমে বোঝাই যাচ্ছিল না সেটা কী। তারপর সেই রেখা বাঁক নিতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তৈরি হলো অর্ধচন্দ্রাকৃতির এক রংধনু।
চাঁদের আলোয় জন্ম নেওয়া সেই বিরল ‘মুনবো’। এটা দিনের রংধনুর মতো উজ্জ্বল ছিল না। এর রঙ ছিল মৃদু, প্রায় স্বপ্নের মতো। সাদা আলোর ভেতরে লুকিয়ে ছিল হালকা লাল, নীল আর বেগুনি আভা। খালি চোখে সব রঙ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু ক্যামেরার দীর্ঘ এক্সপোজারে যেন লুকানো সৌন্দর্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
চারপাশে তখন শুধু বিস্ময়ের শব্দ। কেউ চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। কেউ অবিশ্বাসে হেসে উঠছিল। আবার কেউ নিঃশব্দে ছবি তুলছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ জোরে কথা বললে হয়তো রংধনুটি মিলিয়ে যাবে। সেই মুহূর্তে জলপ্রপাতের শব্দও যেন বদলে গিয়েছিল। আগের মতো ভয়ংকর লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল প্রকৃতি নিজেই ধীরে ধীরে কোনো গোপন গল্প শোনাচ্ছে।
আমি এক ভিউপয়েন্ট থেকে আরেক ভিউপয়েন্টে হাঁটছিলাম। কোথাও রংধনুটা আরও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, কোথাও আবার কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিবার নতুন করে দেখার সময় মনে হচ্ছিল, এ যেন বাস্তব না— কোনো স্বপ্ন।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা আরও বাড়ছিল। ভেজা কাপড় শরীরের সঙ্গে লেগেছিল। হাত-পা জমে যাচ্ছিল। কিন্তু তবুও সেখান থেকে চলে যেতে মন চাইছিল না।
অবশেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে রংধনুটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করল। কুয়াশার ভেতরে হারিয়ে গেল তার শেষ আলোটুকুও। আবার চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল। রয়ে গেল শুধু অবিরাম জলধারার গর্জন।
ক্যাম্পে ফিরে এসে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম। একই পূর্ণিমার আলো তখনো আকাশে ঝুলে ছিল। অন্ধকারের মধ্যে খাবার রান্না করতে করতে বারবার মনে হচ্ছিল— কত অল্পের জন্য হয়তো এই অভিজ্ঞতাটা মিস হয়ে যেতে পারত।
সীমান্তে যদি একটু বেশি সময় লাগত। যদি রাতে আর ফিরে না আসতাম। যদি ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে পড়তাম। তাহলে হয়তো জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দৃশ্যগুলোর একটি কোনোদিন দেখাই হতো না।
হয়তো এ কারণেই ‘মুনবো’ এত বিশেষ। এটা শুধু একটা প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটা ধৈর্যের পুরস্কার। অনিশ্চয়তার ভেতর অপেক্ষা করার গল্প। সঠিক সময় আর সঠিক জায়গায় উপস্থিত থাকার বিস্ময়। আর সেই কারণেই একবার যে মানুষ ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা সেই রংধনু দেখে। তার স্মৃতিতে সেটি সারাজীবনের জন্য থেকে যায়।
লেখক : সারাহ স্টেগার, একজন অস্ট্রেলীয় ভ্রমণ লেখক ও সাবেক প্রিন্ট সাংবাদিক







