জাপানে পাড়ি দিচ্ছেন উত্তর-পূর্ব ভারতের তরুণরা

জাপানে পাড়ি জমাতে চাইছেন উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু তরুণ-তরুণী। ছবি: সংগৃহীত
আইজলের ব্যস্ত দিন শেষে ঘরে ফেরেন জ্যানেট লালনুংসাঙ্গি। দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ, নিজের ছোট অনলাইন ব্যবসা সামলানো, এরপর বাড়িতে মাকে সহযোগিতা করা, সারাদিনের ব্যস্ততা কম নয়। তবু রাতে একটু সময় পেলেই সোফায় বসে মুঠোফোনে সিনেমা চালান তিনি। ভাষাটি কিছুটা বুঝতে পারলেও পুরোপুরি আয়ত্তে আসেনি। তাই ইংরেজি অনুবাদ না দেখে জাপানি ভাষায় সংলাপ শুনে শুনে কানকে অভ্যস্ত করছেন। জাপানি সিনেমা দেখার এই অভ্যাসই এখন তার নতুন জীবনের প্রস্তুতির অংশ।
৩৩ বছরের জ্যানেট মিজোরামের বাসিন্দা। গত মার্চে জাপানে পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা ও দক্ষতার পরীক্ষা পাস করেছেন গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে স্নাতক এই তরুণী। ফুকুওকা শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে তার কাজের সুযোগ হয়েছে। এখন অপেক্ষা করছেন প্রয়োজনীয় যোগ্যতার সনদের জন্য। জাপানে দীর্ঘমেয়াদি থাকার ক্ষেত্রে এই নথি প্রয়োজন হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী অক্টোবরেই ফুকুওকার ওই প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দেওয়ার আশা করছেন তিনি।
তত দিন পর্যন্ত অবশ্য প্রস্তুতি থামছে না জ্যানেটের। বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাড় করতে এখনো পূর্ণ সময়ের কাজ করছেন তিনি। এর ফাঁকে প্রাথমিক পর্যায়ের জাপানি ভাষা অনুশীলন করছেন। কখনো সিনেমা দেখে, আবার কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কথোপকথন ব্যবস্থার সঙ্গে জাপানি ভাষায় কথা বলে নিজের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন।
জ্যানেটের মতো মিজোরামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বহু তরুণ এখন তাকিয়ে আছেন জাপানের দিকে। ছোট শহরগুলোতে অনেকে জাপানি ভাষা শিখছেন, দক্ষতার পরীক্ষা দিচ্ছেন এবং পরিচর্যাসহ বিভিন্ন কাজে জাপানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে তরুণীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নেওয়া, ছোট ভাইবোনদের সহযোগিতা করা এবং নিজের জীবনে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এই বিদেশযাত্রার পেছনে জাপানেরও বড় প্রয়োজন রয়েছে। দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে দেশটি। ফলে বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি তীব্র হচ্ছে। সেই ঘাটতি পূরণে জাপান বিদেশি কর্মীদের দিকে ঝুঁকেছে। ২০১৯ সালে দেশটি ‘নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী’ নামে নতুন এক ধরনের বসবাসের মর্যাদা চালু করে। নির্দিষ্ট দক্ষতার পরীক্ষায় পাস এবং জাপানি ভাষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিদেশি কর্মীরা এর আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কাজের অনুমতি পেতে পারেন।
পরিচর্যা, শিল্পপণ্য উৎপাদন, খাদ্য ও পানীয়সহ ১৬টি খাতে বিদেশি কর্মী নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে জাপান। অর্থাৎ একদিকে বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে জাপানে বাড়ছে কর্মীর প্রয়োজন, অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের তরুণদের সামনে খুলছে বিদেশে কাজের নতুন সুযোগ।
জ্যানেটের মুঠোফোনের পর্দায় তাই জাপানি সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আরেকটি স্বপ্ন। আইজল থেকে বহু দূরে ফুকুওকায় নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন। দূর দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা আর ঘরের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া তরুণদের আকাঙ্ক্ষার টানেই যেন তৈরি হচ্ছে জাপানমুখী এক নতুন পথ।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন








