কলকাতায় আরএসএস ঘনিষ্ঠ সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনা
- সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের ঘটনায় ৪ মামলা

কলকাতার একটি জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়াম ঘিরে রবিবার যে উত্তেজনার শুরু, রাত গড়াতেই তা রূপ নেয় সংঘর্ষে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, বহিরাগতদের জমায়েত, ছাত্রদের আহত হওয়ার খবর এবং পুলিশের সামনেই বারবার হাতাহাতির ঘটনায় সোমবারও থমথমে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট। ঘটনার জেরে পঞ্চসায়র থানায় চারটি পৃথক এফআইআর হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত হয় রবিবার, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের মূল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান করছিল আরএসএস ঘনিষ্ঠ সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত সমিতি। তবে ছাত্রদের একাংশের প্রশ্ন ছিল, তাদের অন্ধকারে রেখে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনকে কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হল।
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, অনুষ্ঠানের জায়গায় গিয়ে আপত্তি জানাতেই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু হয়। কয়েকজন ছাত্রের দাবি, তাদের ‘জঙ্গি’, ‘নকশাল’, ‘দেশবিরোধী’ এমনকি ‘বাংলাদেশি’ বলেও কটাক্ষ করা হয়। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ছাত্রদের দাবি, তাদের ওপর চড়াও হন অনুষ্ঠানে আসা কয়েকজন ব্যক্তি। এমনকি ছাত্রীরাও হেনস্তার শিকার হন বলে অভিযোগ। এক ছাত্রের দাবি, প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এ ঘটনায়। পাল্টা অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত সমিতির অভিযোগ যে, অনুষ্ঠান চলাকালীন বেশকিছু ছাত্র সেখানে ঢুকে ব্যানার ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে।
এ পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। ছাত্ররা গেট বন্ধ করে দেন। বাইরে জড়ো হন সংগঠনের সমর্থক ও স্থানীয় বিজেপি নেতারা। দু’পক্ষের মধ্যে ‘জয় শ্রীরাম’, ‘জয় ভীম’, ‘আজাদি’ সহ নানা স্লোগান শোনা যায়। বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভিতরে ইট ও জলের বোতল ছোড়ার অভিযোগও ওঠে। পরিস্থিতি সামলাতে ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশবাহিনী পৌঁছায়। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতেও কয়েক দফায় হাতাহাতি হয়। সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববুদ্যালয়েও একই ঘটনা ঘটে।
ছাত্রদের আরও অভিযোগ, তাদের তাড়া করে লাইব্রেরি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে আশ্রয় নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। এমনকি লাইব্রেরিয়ানকেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে শিক্ষক ও কর্মীদের কয়েকজনও আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এক ব্যক্তিকে প্রায় অর্ধনগ্ন করে মারধরের অভিযোগও ওঠে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
এর ফলে আহত ছাত্রছাত্রীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্যাম্পাসে অ্যাম্বুল্যান্স ঢোকানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু অশান্তির কারণে সেটি কিছু সময় আটকে ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাত পর্যন্ত টানা সাত থেকে আট ঘণ্টা উত্তেজনা চলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
অন্যদিকে সোমবারও ইনস্টিটিউটের বাইরে পুলিশ মোতায়েন ছিল। পঞ্চসায়র থানায় অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত সমিতি, পড়ুয়াদের একাংশ এবং পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট চারটি এফআইআরের কথা বলা হলেও চার নম্বর মামলাটির বিস্তারিত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন ভেঙে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পূর্ব কলকাতার উপ-কমিশনারের কথায়, “আইনের বাইরে কিছু করতে পারি না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অন্যদিকে ছাত্রদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিতরে বহিরাগতদের এনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া শুধু তাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, ক্যাম্পাসের স্বাধীন পরিবেশ নিয়েও বড় প্রশ্ন। সোমবারও সেই ক্ষোভে প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।



