ফের আলোচনায় বিলকিস বানো মামলা
রাহুলের নিশানায় নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী

সংগৃহীত ছবি
সংসদে বিজেপির নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীকে ঘিরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রার তীব্র সমালোচনার জেরে আবারও জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে বিলকিস বানো গণধর্ষণ মামলা। ২০২২ সালে বিলকিস বানো গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড মামলায় দোষী সাব্যস্ত ১১ জনের মুক্তির সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যেই সমর্থন করেছিলেন প্রহ্লাদ জোশী। আর এবার সেই প্রসঙ্গ টেনেই রাহুল তাকে ‘ধর্ষকদের রক্ষাকারী’ বলে আক্রমণ করেন। এরপরই বহু বছরের পুরনো এই বহুচর্চিত মামলাটি নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
উল্লেখ্য যে, এই মামলার সূত্রপাত হয় ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময়। ৩ মার্চ, ২০০২ সালে গুজরাটের দাহোদ জেলার রন্ধিকপুর গ্রামের কাছে পরিবার সহ প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছিলেন তখন ২১ বছরের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস বানো। সেই সময় একটি উন্মত্ত জনতার দল তাদের উপর অতর্কিতে হামলা চালায়। আদালতের নথি অনুযায়ী বিলকিস বানোকে গণধর্ষণ করা হয়। এছাড়া তার তিন বছরের কন্যাসহ পরিবারের সাত সদস্যকে নির্মমভাবে তার চোখের সামনেই হত্যা করা হয়। যদিও বিলকিস প্রাণে বেঁচে যান এবং পরবর্তীকালে তিনিই এই মামলার প্রধান সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন।
ঘটনার পর বিলকিস বানো অভিযোগ করেন যে, স্থানীয় পুলিশের তদন্তে গুরুতর ত্রুটি ছিল। তার প্রথম অভিযোগে গণধর্ষণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। এরপরে স্থানীয় পুলিশ জানায় যে , অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের কাছে বিচার না পেয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিলকিস সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হন।
এরপর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিমকোর্ট তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) এর হাতে তুলে দেয়। পাশাপাশি শীর্ষ আদালত মনে করে যে, গুজরাটে এই মামলার নিরপেক্ষ বিচার হওয়া কঠিন। আর সেই কারণেই বিচারপ্রক্রিয়া গুজরাট থেকে মহারাষ্ট্রে স্থানান্তরিত করা হয় এবং মুম্বইয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতে মামলার নতুন করে শুনানি শুরু হয়।
এরপর ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে মুম্বইয়ের বিশেষ সিবিআই আদালত গণধর্ষণ ও হত্যাসহ একাধিক অপরাধে ১১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। যদিও সে সময় প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন পুলিশকর্মী ও চিকিৎসককে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের মে মাসে বোম্বে হাইকোর্ট ১১ জনের সাজা বহাল রাখার পাশাপাশি ৫ পুলিশ কর্মী ও ২ চিকিৎসককে প্রমাণ নষ্ট করা এবং ভুল নথি তৈরির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। পরে সুপ্রিমকোর্টও তাদের আপিল খারিজ করে দেয়।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে বিলকিস বানোর পুনর্বাসনের স্বার্থে গুজরাট সরকারকে তাকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় সুপ্রিমকোর্ট । পাশাপাশি সরকারি চাকরি সহ উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল যে , তার মৌলিক অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হওয়ায় পুনর্বাসনের জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু ১৫ আগস্ট ২০২২ সালে গুজরাটের বিজেপি সরকার মামলায় দোষী সাব্যস্ত ১১ জনেরই সাজা মকুব করে দেয় এবং জেল থেকে তারা মুক্তি পান। এই সিদ্ধান্ত সে সময় দেশজুড়ে প্রবল বিতর্কের জন্ম দেয়। বিলকিস বানো সহ একাধিক আবেদনকারী সুপ্রিমকোর্টে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দাবি করেন যে, যেহেতু মামলার বিচার মহারাষ্ট্রে হয়েছে তাই গুজরাট সরকারের মুক্তি দেওয়ার আইনি ক্ষমতা ছিল না।
২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্ট গুজরাট সরকারের সেই মুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। আদালত জানায় যে এই মামলায় মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুজরাট ‘উপযুক্ত সরকার’ ছিল না এবং আইনি ক্ষমতা ছাড়াই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে ওই ১১ জন দোষীকে আত্মসমর্পণ করে ফের কারাগারে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে এই রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়নি। শুধুমাত্র মুক্তির বৈধতা নিয়েই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে ভারতের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় বিলকিস বানো মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ এই মামলার মাধ্যমে সংবেদনশীল অপরাধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে মামলা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের নীতি, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সুরক্ষা, সাজা মকুবের সিদ্ধান্তের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা এবং অন্য রাজ্যে বিচার স্থানান্তরিত হলে কোন রাজ্য সরকারের মুক্তি (রেমিশন) দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে কি থাকবে না - এই সব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির তৈরি হয়েছে।
আর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেও রয়েছে এই মামলাই। সংসদে প্রহ্লাদ জোশীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাতে গিয়ে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা ২০২২ সালের মুক্তিকে সমর্থন করার তার পুরনো মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। ফলে বিলকিস বানো মামলা আবারও আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।




