স্কুল মিলে নিরামিষ খাবার নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা, পুষ্টি ও কর্মসংস্থান নিয়ে চাপে বিজেপি সরকার

সংগৃহীত ছবি
কলকাতার পৌর এলাকার সরকারি স্কুলগুলিতে মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচির খাবার সরবরাহের দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হল। শুক্রবার এই সিদ্ধান্তের বৈধতা, স্বচ্ছতা এবং তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে, স্কুলপড়ুয়াদের খাদ্যতালিকা থেকে ডিম ও মাছের মতো আমিষ খাবার সরিয়ে দিয়ে কেন রাজমা, ডাল, সয়াবিন ও পনীরভিত্তিক নিরামিষ খাদ্যতালিকা চালুর পথে হাঁটছে বিজেপি সরকার।
মামলাকারীদের বক্তব্য, বিষয়টি শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাসের নয়। তা শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। রাজ্যের বহু দরিদ্র পরিবারের সন্তান নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায় না। তাদের কাছে স্কুলের মধ্যাহ্নভোজই অনেক সময় দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ আহার। সেই পরিস্থিতিতে প্রাণীজ প্রোটিনসমৃদ্ধ ডিম বা মাছ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এই জনস্বার্থ মামলার জরুরি শুনানির আবেদন জানানো হয় কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে। তবে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র মামলার নথি পর্যালোচনা এবং প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময় চান। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে আগামী মঙ্গলবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে।
মামলাটি দায়ের করেছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র এবং আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তার অভিযোগ, খাদ্যতালিকা থেকে মাছ ও ডিমের মতো খাবার বাদ দেওয়া হলে পড়ুয়ারা প্রয়োজনীয় প্রাণীজ প্রোটিন থেকে বঞ্চিত হবে। এর ফলে শিশুদের পুষ্টি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মামলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচির দায়িত্ব একটি বাইরের সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ফলে রাজ্যের হাজার হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের জীবিকা সংকটের মুখে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বহু মহিলা নিজেদের পরিবার চালানোর জন্য এই কাজের উপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তাদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, তা খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে আদালতের কাছে।
মামলাকারীদের দাবি, গোটা প্রক্রিয়ার পিছনে কোনও অস্বচ্ছতা বা অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, একদিকে শিশুদের পুষ্টির প্রশ্ন, অন্যদিকে দরিদ্র মহিলাদের রুজি-রুটির বিষয়- দুটিই জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর গত ২৪ জুন বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সেই বাজেটের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, কলকাতার পুর এলাকার স্কুলগুলিতে মধ্যাহ্নভোজের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
গুজরাত-সহ দেশের একাধিক রাজ্যে এই দায়িত্ব পালন করে থাকে ইসকন। হিন্দু ধর্মীয় এই সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন খাদ্যতালিকায় সয়াবিন, রাজমা এবং পনীরের মতো উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান রাখা হবে। তবে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটাই প্রশ্ন- যে সব শিশু বাড়িতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায় না, তাদের জন্য স্কুলের মধ্যাহ্নভোজ কি শুধু পেট ভরানোর ব্যবস্থা, নাকি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর কলকাতা হাইকোর্টের আসন্ন শুনানির দিকে।
উল্লেখ্য যে,ভারতে মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্প বা মিড ডে মিল জাতীয় স্তরে প্রথম চালু হয় ১৯৯৫ সালের ১৫ আগস্ট, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের আমলে। পরে ২০০১ সালে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে সরকারি স্কুলগুলিতে রান্না করা মধ্যাহ্নভোজ পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা হয়। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং অপুষ্টি কমানো।




