বিদেশি শিক্ষার্থী কমায় ধুঁকছে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়, কিনতে চায় ইউরোপীয় শিক্ষাগোষ্ঠী

সংগৃহীত ছবি
বিদেশি শিক্ষার্থী কমেছে, সঙ্গে বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। দেশীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিও বছরের পর বছর প্রকৃত খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। সব মিলিয়ে ব্রিটেনের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থায় এখন টান। এই সংকটেই সুযোগ দেখছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুনাফাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা গোষ্ঠী গ্যালিলিও গ্লোবাল এডুকেশন। আর্থিক সমস্যায় থাকা একাধিক ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে গ্যালিলিওর প্রধান নির্বাহী কামিল সেনহাজি জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় বিনিয়োগের জন্য ব্রিটেন তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় বাজার। সম্ভাব্য কয়েকটি অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গ্যালিলিওর নজরে রয়েছে, তা প্রকাশ করেননি তিনি। আলোচনার কোনোটি এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগ্রহটি নিছক ধারণার পর্যায়ে নয়, কিন্তু এখনই কোনো চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার অবস্থাও তৈরি হয়নি।
গ্যালিলিও গ্লোবাল এডুকেশন ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুনাফাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে তারা ২০টি দেশে প্রায় ১৩০টি ক্যাম্পাসের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে; শিক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ। গোষ্ঠীটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা, প্রযুক্তি, ফ্যাশন, নকশা, শিল্পকলা ও অন্যান্য পেশাভিত্তিক বিষয়ে পড়ানো হয়।
এর নেটওয়ার্কে রয়েছে প্যারিস স্কুল অব বিজনেস, ইতালির ইস্তিতুতো মারাঙ্গোনি, জার্মানির ম্যাক্রোমিডিয়া ইউনিভার্সিটি ও পিএফএইচ ইউনিভার্সিটি, নরওয়ের নরঅফসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ব্রিটেনেও গ্যালিলিও নতুন নয়, ২০২০ সাল থেকেই লন্ডনের রিজেন্টস ইউনিভার্সিটি তাদের মালিকানাধীন নেটওয়ার্কের অংশ।
সেনহাজির বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার জন্য পরিচালিত, এ নিয়ে তারা কোনো রাখঢাক করে না। কিন্তু দ্রুত টাকা তুলে নেওয়াই তাদের ব্যবসায়িক কৌশল নয়। ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে তিনি জানিয়েছেন, গ্যালিলিও এখন পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়নি; তাদের পুঁজিকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
ব্রিটেনে আরও বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণের আগ্রহের পেছনে রিজেন্টস ইউনিভার্সিটিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন সেনহাজি।
২০২০ সালে কোভিড মহামারির ধাক্কায় শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাওয়ার পর রিজেন্টস গুরুতর আর্থিক সমস্যায় পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব আর্থিক নথি অনুযায়ী, তখন গ্যালিলিওর ২ কোটি ২৫ লাখ পাউন্ডের নগদ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক স্থিতিশীলতা দেয় এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দেয়।
গ্যালিলিও এবার সেই অভিজ্ঞতা অন্য ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজে লাগাতে চায়। সেনহাজির বক্তব্য, রিজেন্টসে যে পুনরুদ্ধার হয়েছে, সেটির পুনরাবৃত্তির সুযোগ থাকলে তারা ব্রিটিশ বাজারে আরও এগোতে প্রস্তুত। তবে তিনি এ-ও জোর দিয়ে বলেছেন, আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে বলেই দুর্বল প্রতিষ্ঠান ‘শিকার’ করতে বেরিয়েছে গ্যালিলিও, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়।
রিজেন্টসের উপাচার্য জেফ স্মিথও বেসরকারি মালিকানার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, গ্যালিলিওর অংশ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার, ব্যয় এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলের দিকে আরও কঠোরভাবে নজর দিতে হয়েছে। বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার কারণে এখন প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিতে পারছে বলে তাঁর দাবি।
গ্যালিলিওর নজর এমন সময়ে, যখন ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষার আর্থিক সংকট আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের শিক্ষা কমিটি গত মে মাসে সতর্ক করেছে, ইংল্যান্ডের উচ্চশিক্ষা খাতে এখন প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস ফর স্টুডেন্টস পার্লামেন্টকে জানিয়েছিল, ২৪টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামী ১২ মাসের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে; এর মধ্যে সাতটির শিক্ষার্থীসংখ্যা ৩ হাজারের বেশি।
সংকটের একটি বড় কারণ দেশীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। ২০১২-১৩ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি ধরলে এই ফি বাস্তব অর্থে অনেকটাই কমেছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ টিউশন ফি ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ডে উঠলেও সরকারের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ২০১২-১৩ সালের মূল্যে সেটি মাত্র ৫ হাজার ৯২০ পাউন্ডের সমান। একই সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন, জ্বালানি, ভবন রক্ষণাবেক্ষণসহ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
এই ব্যবধান মেটাতে বহু বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর টিউশন ফির উপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু অভিবাসননীতি, ভিসার নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাজারের ওঠানামায় সেই আয়ও এখন অনিশ্চিত। শিক্ষা কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর আয়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা এখন গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
শুধু বেসরকারি অধিগ্রহণ নয়, সংকট থেকে বাঁচতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদের মধ্যেও একীভূত হওয়ার আলোচনা বাড়ছে।
ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জোট ইউনিভার্সিটিজ ইউকের মার্চ-এপ্রিলের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীর অংশীদারত্ব বা একীভূত হওয়ার মতো পথ তারা বিবেচনা করতে পারে। একই জরিপে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বলেছে, টিউশন ফি বাড়লেও নতুন নীতি ও ব্যয় বৃদ্ধির আর্থিক চাপ পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাবে না।
ইতিমধ্যে ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষায় বড় ধরনের একীভূতকরণের নজিরও তৈরি হচ্ছে। ফলে গ্যালিলিওর মতো বেসরকারি শিক্ষাগোষ্ঠীর আগ্রহ এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা, একীভূতকরণ এবং পরিচালন কাঠামো নিয়েই পুরো খাতে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে।
তবে ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় মুনাফাভিত্তিক মালিকানা এখনও ব্যতিক্রম। সেনহাজিও স্বীকার করেছেন, শুধু ব্রিটেন নয়, ইউরোপজুড়েই ‘মুনাফার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়’ ধারণা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইউরোপের উচ্চশিক্ষার বিপুল অংশ এখনও সরকারি বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের হাতে। এই মানসিক বাধাকে গ্যালিলিওর সম্প্রসারণের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর যুক্তি অবশ্য উল্টো। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান যখন নিজস্ব আর্থিক চাপে রয়েছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি পুঁজি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা এবং নতুন কোর্স তৈরির সুযোগ দিতে পারে। তবে তিনি ব্রিটেনে দ্রুত বেড়ে ওঠা ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ মডেল থেকে গ্যালিলিওকে আলাদা রাখতে চাইছেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভাবে পাঠদান করানোর ওই মডেলে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আর্থিক ছবি যতই উদ্বেগজনক হোক, দীর্ঘমেয়াদে দেশটির উচ্চশিক্ষার শক্তি নিয়ে সেনহাজির সংশয় নেই। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় তিন-চারটি উচ্চশিক্ষা বাজারের মধ্যে থাকতে হলে ব্রিটেনে উপস্থিতি জরুরি–এমনটাই তাঁর মূল্যায়ন।
সেই কারণেই বর্তমান সংকটকে গ্যালিলিও শুধু দুর্বলতার গল্প হিসেবে দেখছে না। তাদের চোখে এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগও। কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই, অর্থকষ্টে থাকা শতাব্দীপ্রাচীন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে যদি এক দিকে দেউলিয়া হওয়ার ভয়, অন্য দিকে বেসরকারি মালিকানার প্রস্তাব আসে, তারা কোন পথ বেছে নেবে?
ব্রিটেনের উচ্চশিক্ষার পরবর্তী বড় বিতর্ক তাই হয়তো শুধু কোন বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচবে তা নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকই বা কে হবে, সেই প্রশ্ন নিয়েও।




