সেউতায় আটকে শত শত শিশু, খাদ্য-পানির জন্য রাস্তায় ভিক্ষা

সংগৃহীত ছবি
মরক্কো থেকে গত সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষ স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায় প্রবেশ করার পর এখনো শত শত অভিবাসী শিশু রাস্তায় দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্পেনের এ ছিটমহল এলাকায় প্রায় ৮৬০ শিশু আটকে রয়েছে। তাদের অনেকেই খাবার ও পানির জন্য রাস্তায় ভিক্ষা করছে।
স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সেউতায় প্রবেশ করা প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসীর প্রায় সবাইকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সোমবার জানিয়েছে, এখনো সেখানে রয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার মানুষ।
সীমান্ত পার হওয়ার সময় অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শিশুও।
স্পেনের আইন অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীরা আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তাদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে মরক্কোর নাগরিকদের মানবিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ সাধারণত খুবই সীমিত।
অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গ ছাড়া আসা অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের সুরক্ষা দেওয়ার এবং তাদের দেখভালের দায়িত্ব স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের।
তানজিয়ারের ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছে, সেউতা ও মরক্কোর সীমান্তবেষ্টনী ঘুরে সাঁতরে পার হওয়ার সময় তার আট বছর বয়সী ভাই মারা গেছে।
বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি তার মাকেও হারিয়েছেন। গত চার দিন ধরে তিনি একাই রয়েছেন।
তার ভাষ্য, স্থানীয় কিছু মানুষ তাকে খাবার ও কাপড় দিয়েছেন। এক নারী তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গোসল করার সুযোগও করে দেন। পরে তিনি সরকারের পরিচালিত একটি কিশোরকেন্দ্রে যান, কিন্তু সেখানে আর জায়গা ছিল না।
তিনি বললেন, ‘আমি দেখেছি মানুষ মৃতদেহের ওপর দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে। এখন আমরা শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষা করছি।’
এপির এক সাংবাদিক দেখেছেন, স্প্যানিশ সেনারা এক মরোক্কান শিশুকে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। শিশুটি কান্নাকাটি করছিল এবং তাকে যেন মরক্কোয় ফেরত না পাঠানো হয়, সেই অনুরোধ করছিল।
সীমান্তে পৌঁছানোর কয়েক মিটার আগে স্থানীয় বাসিন্দারা জোর দিয়ে বলেছেন, ছেলেটি অপ্রাপ্তবয়স্ক। এরপর স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করে স্প্যানিশ সিভিল গার্ডের কাছে হস্তান্তর করেন।
৮৪ হাজার জনসংখ্যার সেউতা শহরে অভিবাসীদের এ ঢল স্থানীয় প্রশাসনকে চাপে ফেলে দিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাজনৈতিক সংকটেরও সৃষ্টি করেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের অভিবাসন নীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের নেতাদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। মঙ্গলবার তারা এ বিষয়ে বৈঠকে বসবেন।
ফিনল্যান্ড থেকে মাল্টাসহ ২২টি ইউরোপীয় দেশের নেতাদের স্বাক্ষর করা এক খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, স্পেনের একটি সাম্প্রতিক সময়ের আদালতের রায় ‘আমাদের অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর এ আক্রমণকে’ উসকে দিয়েছে।
৬০০ জনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সেউতার অভিবাসীকেন্দ্রটি পুরোপুরি ভর্তি হয়ে গেছে। কেন্দ্রটি এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা যেন বাইরে অপেক্ষমাণ অভিবাসীদের কাছে খাবার বা পানি পৌঁছে দিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করছেন কর্মীরা।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সেখানে খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গৃহহীন অভিবাসীরা রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন এবং ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন।
দ্য টাইমস জানিয়েছে, অভিবাসীদের মরক্কোয় ফিরে যেতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সেউতার বাসিন্দাদের তাদের সহায়তা করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
দোকানিরা জানিয়েছেন, পুলিশও তাদের অভিবাসীদের কাছে খাবার ও পানি বিক্রি না করার অনুরোধ করেছে, যাতে তারা দ্রুত ফিরে যায়।
স্পেন ও মরক্কো জরুরি ভিত্তিতে এমন ব্যবস্থা কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে, যার আওতায় অবৈধভাবে গণহারে প্রবেশকারীরা স্বেচ্ছায় ফিরে না গেলে তাদের বহিষ্কার করা হবে।
মরক্কো থেকে আসা অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হয় স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন, অথবা স্প্যানিশ পুলিশ তাদের সীমান্ত পেরিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে।
তবে সেউতায় এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এমন মানুষ রয়েছেন, যারা মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে পালিয়ে এসেছেন।
এদিকে অভিবাসী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা এবং সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশের পাশাপাশি কিছু স্বঘোষিত টহলদলও অভিবাসীদের নিজ নিজ এলাকায় ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। বাসিন্দাদের অভিবাসীদের ভয় দেখানো এবং তাড়া করার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এল প্রিন্সিপে এলাকার ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ এল পাইসকে শুক্রবারের একটি ভিডিও দেখিয়েছেন, যেখানে সেউতার এক বাসিন্দাকে ছুরিকাঘাত করতে দেখা যায়। তিনি বললেন, ‘অনেককে এল প্রিন্সিপে থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তারা এখানে এসেছে। এখানে সেউতার অন্যতম বড় মসজিদ রয়েছে। তারা ভেবেছিল এখানে খাবার পাবে।’
স্পেনের এ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নেতারা ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি ২০২১ সালের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে দুই দিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল মরক্কো।
স্পেনের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে মরক্কো পরিকল্পিতভাবে এ সীমান্ত পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে সোমবার স্পেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, মরক্কো গণহারে সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনা পরিকল্পনা করেনি, তবে তা ঘটতে দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল নেতা হুয়ান জেসুস ভিভাস বলেছেন, ‘এটি ভয়াবহ। মর্গে ৮৮টি মরদেহ রয়েছে। সীমান্তের ওপারেও আরও মরদেহ আছে।’
তিনি এল পাইসকে বললেন, ‘মানুষ এটিকে শুধু অভিবাসন সংকট হিসেবে দেখছে না। এটি মূলত একটি হামলা, স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন। মানুষের মনে হয়েছে, এটি পরিকল্পিত না হলেও অন্তত মরক্কো এটিকে উৎসাহ দিয়েছে বা ঘটতে দিয়েছে।’




