ব্রিটিশ কৃষিতে তিন বছরে ক্ষতি ৫ বিলিয়ন পাউন্ড

ছবি: রয়টার্স
একদিকে মাঠজুড়ে শুকিয়ে যাওয়া ফসল, অন্যদিকে হিসাবের খাতায় বাড়তে থাকা ক্ষতির অঙ্ক। ব্রিটেনের কৃষকদের জন্য টানা তিন বছর যেন পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নে। অতিবৃষ্টি, খরা ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের আঘাতে দেশটির শস্য উৎপাদন এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, গত তিন বছরে কৃষকদের সম্ভাব্য আয় কমেছে প্রায় ৪৮০ কোটি পাউন্ড (প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড)।
মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) প্রকাশিত এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইসিআইইউ)-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের টানা খারাপ ফসলের কারণে ব্রিটেনের গম, যব, ওটস ও তেলবীজ উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির আর্থিক মূল্য হিসাব করে দেখা গেছে, কৃষকদের আয় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮০ কোটি পাউন্ড।
ইসিআইইউ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফসল পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি ১৯৮৪ সালের পর থেকে ব্রিটেনের সবচেয়ে খারাপ শস্য উৎপাদনের বছর হতে পারে। চলতি বছরের গম, বসন্তকালীন যব, শীতকালীন যব, ওটস এবং তেলবীজের উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হয়েছে।
ফসলের মাঠে জলবায়ুর আঘাত
ব্রিটিশ কৃষকদের দুর্দশার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চরম আবহাওয়া। ২০২৬ সালে বসন্তের শুরু থেকেই অস্বাভাবিক শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর মে, জুন, জুলাই ও আগস্টে একের পর এক তাপপ্রবাহ কৃষিজমিকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।
ইসিআইইউ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের উৎপাদন ঘাটতির কারণে গম, যব, ওটস ও তেলবীজের মোট উৎপাদন ২০১৪-২০২৩ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফসল উৎপাদন প্রায় ১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে নেমে আসতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় আরও কম। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের আয় কমবে আরও প্রায় ১৬ কোটি পাউন্ড।
তিন বছর ধরে শুধু ক্ষতি
ক্যামব্রিজের কৃষক মার্টিন লাইনস বলেছেন, টানা তিনটি খারাপ ফসল কৃষি খাতের জন্য ভয়াবহ আঘাত। তাঁর কথায়, কৃষকরা সাধারণত ভালো ও খারাপ বছর মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন, কিন্তু পরপর তিন বছর এমন বিপর্যয় ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তুলছে।
চার বছরের মধ্যে তিনটিই ভয়াবহ ফসল বিপর্যয়
ইসিআইইউ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬—এই দশকের চারটি বছরই ব্রিটেনের সবচেয়ে খারাপ ফসলের তালিকায় উঠে আসতে পারে। অর্থাৎ গত কয়েক বছরের মধ্যে বারবার চরম আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে।
২০২৪ সালে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। মাঠে পানি জমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় বীজ বোনা ও ফসলের পরিচর্যা ব্যাহত হয়। এরপর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে সেই সংকট আরও গভীর করে খরা ও তাপপ্রবাহ।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্রিটেনের খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্যদ্রব্যের দাম এবং আমদানিনির্ভরতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসিআইইউ-এর খাদ্য ও কৃষি বিশ্লেষক টম ল্যাঙ্কাস্ট বলেছেন, ব্রিটিশ কৃষকেরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি আঘাতের মুখে রয়েছেন। তাঁদের উৎপাদন সক্ষমতা রক্ষা করতে হলে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা, পানির অবকাঠামো এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা
ব্রিটেনের এই কৃষি সংকট বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কারণ বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো সমস্যার মুখোমুখি।
বিশেষ করে গম, ধান, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে আবহাওয়ার পরিবর্তন ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ব্রিটেনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পরিবেশে নয়, সরাসরি কৃষকের আয় ও খাদ্য বাজারেও আঘাত করে।
ব্রিটেনের মাঠে এখন শুকিয়ে যাওয়া শস্য শুধু কৃষকের ক্ষতির গল্প নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এক কঠিন সতর্কবার্তাও। প্রশ্ন একটাই, পরবর্তী ফসল মৌসুমে প্রকৃতি কি কৃষকদের একটু স্বস্তি দেবে, নাকি আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাবে?








