জ্বালানি বিলে বড় ধাক্কা, ফের মূল্যস্ফীতির চাপে ব্রিটেন

নতুন এই চাপের কেন্দ্রে রয়েছে গৃহস্থালির জ্বালানি বিল।
স্বস্তি ফেরার আগেই আবার চাপ। ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্রিটেনে নতুন করে জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জুলাইয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল এক লাফে বাড়ার প্রভাব এবার মূল্যস্ফীতির হিসাবেও ধরা পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ২.৯ শতাংশে উঠতে পারে, জুনে যা ছিল ২.৬ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ হওয়ার কথা আগামী বুধবার (১৯ আগস্ট)।
নতুন এই চাপের কেন্দ্রে রয়েছে গৃহস্থালির জ্বালানি বিল। ব্রিটেনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের জন্য জ্বালানির মূল্যসীমা ১৩ শতাংশ বাড়িয়েছে। সরাসরি ব্যাংক হিসাব থেকে বিল দেওয়া একটি সাধারণ পরিবারের বার্ষিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যয়ের নির্দেশক মূল্যসীমা ১ হাজার ৬৪১ পাউন্ড থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৬২ পাউন্ডে উঠেছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় বছরে প্রায় ২২১ পাউন্ড বেশি।
তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম একই হারে বাড়েনি। অফজেমের হিসাবে, বিদ্যুতের বিল প্রায় ৫ শতাংশ বাড়লেও গ্যাসের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি প্রায় ২৪ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পাইকারি গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছে সংস্থাটি। তবে যাঁরা নির্দিষ্ট মেয়াদের স্থির মূল্যের চুক্তিতে আছেন, তাঁদের অনেকেই এখনই এই বৃদ্ধির আওতায় পড়ছেন না। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ জ্বালানি হিসাব এমন স্থির মূল্যের চুক্তির অধীনে রয়েছে।
হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান আরএসএম ইউকের প্রধান অর্থনীতিবিদ টমাস পিউয়ের মতে, শুধু জ্বালানি বিলের এই বৃদ্ধি জুলাইয়ের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে প্রায় ০.৪৪ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করতে পারে। অবশ্য পেট্রল ও ডিজেলের দাম কিছুটা কমায় সেই ধাক্কার একটি অংশ প্রশমিত হতে পারে। তাঁর সতর্কবার্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপ আবারও ব্রিটিশ পরিবারের দৈনন্দিন আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে আসছে।
স্বস্তির পথে ছিল মূল্যস্ফীতি, বাধা হয়ে দাঁড়াল যুদ্ধ
গত বছর মূল্যস্ফীতি ৩.৮ শতাংশে ওঠার পর ধীরে ধীরে তা কমছিল। জুনে হার নেমে আসে ২.৬ শতাংশে, আর ইরান যুদ্ধ শুরু না হলে তা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি চলে আসবে বলে ধারণা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তেল-গ্যাসের বাজারকে আবার অস্থির করে তুলেছে।
এখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের পূর্বাভাস, বছরের শেষদিকে মূল্যস্ফীতি ৩.২ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তাদের আরও আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি মূল্যস্ফীতি ৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আবার সুদের হার বাড়ানোর প্রশ্নও সামনে এসেছে। বর্তমানে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নীতিনির্ধারণী সুদের হার ৩.৭৫ শতাংশ। বাজারে এখন প্রায় চার ভাগের এক ভাগ সম্ভাবনা ধরা হচ্ছে যে আগামী সেপ্টেম্বরের বৈঠকেই সুদ বাড়ানো হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা আগামী বছরের শেষ নাগাদ দুই দফায় ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট করে সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখছেন।
সুদ বাড়লে মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুবিধা হলেও বাড়ি কেনার ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ ও অন্যান্য ধার নেওয়ার খরচ আবার বাড়বে। ফলে জ্বালানি বিলের সঙ্গে ঋণের কিস্তিও সাধারণ পরিবারের উপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সরকার দিচ্ছে ‘শ্বাস নেওয়ার সুযোগ’
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সপ্তাহেই জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে অক্টোবর থেকে বিদ্যুতের উপর মূল্য সংযোজন কর কমিয়ে একটি সাধারণ পরিবারের বছরে গড়ে ৪৫ পাউন্ড সাশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ইংল্যান্ডে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ২ পাউন্ডে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যবস্থাও বহাল রয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের হিসাবে, এই দুই পদক্ষেপ মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.১ শতাংশ পয়েন্ট কমাতে পারে।
তবে স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য এই সহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে রেজল্যুশন ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি শীতকালে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জ্বালানি বিল থেকে সর্বোচ্চ ১৭৫ পাউন্ড কমানোর জন্য ২০০ কোটি পাউন্ডের জরুরি তহবিল প্রস্তাব করেছে। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবার সহায়তার আওতায় আসতে পারে।
চাপ শুধু বিদ্যুৎ-গ্যাসে নয়। পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফওয়াট খরার সময়ে পানির জন্য ‘সার্জ প্রাইসিং’ বা চাহিদা বেশি থাকলে বেশি দাম নেওয়ার একটি ব্যবস্থা বিবেচনা করছে বলে খবর এসেছে। এর আওতায় গ্রীষ্মে পানির দাম বেশি ও শীতে কম রাখা, অথবা নির্দিষ্ট সীমার বেশি পানি ব্যবহার করলে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার মতো ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এর মধ্যেও ব্রিটিশ অর্থনীতি প্রত্যাশার তুলনায় শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে দ্রুত। প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতি ০.৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, জুলাই থেকে জ্বালানি বিল বৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব সামনে আসায় বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এই গতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
আগামী মঙ্গলবার প্রকাশিত শ্রমবাজারের পরিসংখ্যানে মজুরি বৃদ্ধির গতি আরও কমার আভাস রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে বিদ্যুৎ-গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের বৃদ্ধিও দুর্বল হচ্ছে। সামনে শরৎকালীন বাজেট, তার আগে পরিবারের পকেট সামলানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন বার্নহ্যাম সরকারের বড় পরীক্ষা।






