অভিবাসন ঘিরে ফাটল ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায়
ব্রেক্সিটের দেয়ালে ফের দরজা!
- ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ব্রিটেন, কিন্তু অবাধ চলাচল নিয়ে মন্ত্রিসভায় মতবিরোধ
- পুরনো সম্পর্কে ফিরতে কী মূল্য দিতে হবে লন্ডনকে?

সংগৃহীত ছবি
যে দরজা বন্ধ করতে এক দশক আগে গণভোট হয়েছিল, সেই দরজাতেই আবার কড়া নাড়ছে ব্রিটেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে বদলে গিয়েছিল দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য আর অভিবাসনের হিসাব। এবার সেই দূরত্ব ঘোচাতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। কিন্তু ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর আগেই নিজের মন্ত্রিসভায় দেখা দিয়েছে ফাটল। বিতর্কের কেন্দ্রে সেই পুরনো প্রশ্ন। মানুষের অবাধ চলাচল কি আবার ফিরবে?
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বড় সমঝোতার লক্ষ্যে অভিবাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন বার্নহ্যাম। সরকারি সূত্রগুলোর ধারণা, ইউরোপের বাজারে আরও প্রবেশাধিকার পেতে মানুষের অবাধ চলাচলই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির হাতিয়ার। তবে প্রধানমন্ত্রী এখনও কোনো চূড়ান্ত প্রস্তাব ঠিক করেননি।
এমন সম্ভাবনায় অস্বস্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। অভিবাসন কমানোর কঠোর নীতির পক্ষে তিনি। অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চান অ্যাঞ্জেলা রেইনারসহ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী।
মতবিরোধ প্রকাশ্যে এনেছেন অর্থমন্ত্রী জন হিলিও। জীবদ্দশায় ব্রিটেন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন বার্নহ্যাম। পাল্টা হিলি বলেছেন, ‘আমি অ্যান্ডি বার্নহ্যামের চেয়ে বয়সে বড়। আমার জীবদ্দশায় এমনটা হবে বলে মনে করি না।’ তার মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বিরক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আই নিউজ।
অথচ কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখযোগ্য। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির খসড়া প্রায় চূড়ান্ত। কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য সহজ করা, কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যব্যবস্থা সমন্বয় এবং তরুণদের যাতায়াত ও কাজের সুযোগ বাড়ানোই মূল লক্ষ্য।
আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বার্নহ্যাম। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সমঝোতায় ব্রিটিশ অর্থনীতি প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ডের সুবিধা পেতে পারে। তবে তরুণদের যাতায়াতের সংখ্যা এবং ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন নিয়ে আলোচনা এখনও শেষ হয়নি।
এর মধ্যেই নতুন শর্ত সামনে এনেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক প্রধান ব্রেক্সিট মধ্যস্থতাকারী মিশেল বার্নিয়ে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, ব্রিটেন চাইলে ইউরো মুদ্রা গ্রহণ ছাড়াও ইউনিয়নে ফেরার বিষয়ে আলোচনা করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু মানুষের অবাধ চলাচলের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই।
বার্নিয়ের ভাষায়, ‘চারটি স্বাধীনতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এগুলো নিয়ে দরকষাকষি চলে না।’ অর্থাৎ মানুষ, পণ্য, সেবা ও পুঁজির চলাচল একসঙ্গে মেনে নিতে হবে। শুধু সুবিধাজনক অংশ বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।
২০১৬ সালের গণভোটে ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে। ২০২১ সালে শেষ হয় মানুষের অবাধ চলাচলের অধিকার। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই বাণিজ্যিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক চলছে।
তবে ইউরোপে ফেরার আকাঙ্ক্ষা আর ফেরার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এক নয়। বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, জনগণের মতামতের আগে এগোবেন না।
দশ বছর আগে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ইউরোপ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ব্রিটেন। আজ অর্থনীতির স্বার্থে সেই সীমান্তের বিধিনিষেধ শিথিল করার কথাই ভাবছে দেশটি। ইতিহাসের পরিহাস এখানেই। যে অভিবাসনকে ঘিরে বিচ্ছেদের সূচনা, সেই অভিবাসনই কি এবার পুনর্মিলনের সবচেয়ে বড় শর্ত হয়ে উঠবে?



