সেউতার ধাক্কায় নড়ল ব্রিটেন
ছোট নৌকার ঢল রুখতে কড়া বার্তা বার্নহ্যামের

ছবি: রয়টার্স
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় কয়েক দশক হাজার অভিবাসীর ঢলের পর ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ ঠেকাতে নাছোড় থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
রবিবার ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর ডোভার সফরে উপকূলরক্ষী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান করতেই হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারীদের ব্যবসা ভাঙতে প্রকৃত শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথ তৈরি করাও জরুরি।
বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তাকে আশ্বস্ত করেছেন–সেউতায় ঢোকা আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষের প্রায় ৯৮ শতাংশকে ইতিমধ্যেই মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাৎক্ষণিক সংকট অনেকটাই সামাল দেওয়া গেলেও শেনজেন এলাকা, ইউরোপীয় সীমান্তনীতি এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ডোভারে তিনি বলেছেন, এসব বিষয়ে ইইউর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালাতে চান।
অভিবাসন বিতর্কের ভাষা বদলাতে চান কি না–এ প্রশ্নের উত্তরে বার্নহ্যাম বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে কেবল রাজনীতি করলে হবে না, বাস্তব সমাধানে যেতে হবে। তার কথায়, মানুষ সীমান্তকে নিয়ন্ত্রণহীন দেখতে চায় না। আমাদের সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হবে; আবার যাদের সত্যিই সাহায্য প্রয়োজন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থাও রাখতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, সরকার ধীরে ধীরে একেবারে নতুন পদ্ধতির ভিত্তি তৈরি করছে।
সরকারি প্রাথমিক হিসাবে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ছোট নৌকায় ১৪ হাজার ৫২৬ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ের ২৫ হাজার ৪৩৬ জনের তুলনায় তা ৪৩ শতাংশ কম এবং ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম। তবে গত বুধবারই এ বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ ৭৫২ জন চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছান। এই পরিসংখ্যান সামনে রেখে বার্নহ্যাম বলেছেন, অগ্রগতি হচ্ছে, কিন্তু সরকার আত্মতুষ্ট নয়।
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংগঠিত অভিবাসন অপরাধ দমনে কাজ করা জাতীয় অপরাধ সংস্থার কর্মকর্তার সংখ্যা ২০২৫ সালের শুরু থেকে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে–৩৭৬ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০০। সরকার বলছে, পাচারচক্রের অর্থের উৎস, নৌকা সরবরাহ এবং সীমান্তপারের নেটওয়ার্কে আঘাত করাই এখন মূল লক্ষ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফরাসি উপকূলে নজরদারি জোরদার, পাচারকারীদের গ্রেপ্তার এবং অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর কাজও বাড়ানো হয়েছে।
তবে পরিসংখ্যানের অন্য দিকও রয়েছে। ২০ জুলাই বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে রবিবার পর্যন্ত ছোট নৌকায় ২ হাজার ৫৭ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৬২। শুধু শনিবার চারটি নৌকায় ৩২৬ জন পৌঁছেছেন। ফলে বিরোধীরা বলছে, বার্ষিক হিসাবে পারাপার কমলেও সাম্প্রতিক প্রবাহ এখনও উদ্বেগজনক।
রবিবার লন্ডনের স্ট্র্যাটফোর্ডে জাতীয় অপরাধ সংস্থার সদর দপ্তর সফর করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, সরকারের পদক্ষেপ এখন ফল দিতে শুরু করেছে। তার ভাষায়, অভিবাসীদের নৌকায় ওঠার সিদ্ধান্তের হিসাবটাই বদলে দিতে চান তিনি। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চান, যাতে কেউ বিপজ্জনক যাত্রা শুরুর আগেই সিদ্ধান্ত বদলায়। তবে পাঁচ বছরের বদলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির অপেক্ষা ১০ বছর করার মতো প্রস্তাব নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেই তীব্র আপত্তি রয়েছে।
সেউতায় স্পেন যে দ্রুত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফেরত পাঠিয়েছে, ব্রিটেনও কি সেই পথ নেবে–এ প্রশ্নে মাহমুদ নেতিবাচক উত্তর দেন। তার ব্যাখ্যা, স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে স্থলসীমান্ত এবং ফেরত পাঠানোর দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ইংলিশ চ্যানেলের যৌথ জলসীমা, ফ্রান্সের সঙ্গে আইনি সমন্বয় এবং মানবপাচারচক্রের সক্রিয়তা ব্রিটেনের পরিস্থিতিকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।
সেউতা সংকটে অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে–কেউ ডুবে, কেউ সীমান্তের বেড়া টপকানোর সময় চাপা পড়ে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এই ঢল ৮৫ হাজার জনসংখ্যার শহরটিকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেও তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। স্পেন শনিবার মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন সমুদ্রে ৫০০ মিটার দীর্ঘ ভাসমান প্রতিবন্ধকও স্থাপন করেছে।
বার্নহ্যামের নতুন অবস্থানের সারকথা তাই দ্বিমুখী, এক দিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কড়া অভিযান, অন্য দিকে যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো মানুষের জন্য নিরাপদ প্রবেশপথ। এখন প্রশ্ন, এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি ইংলিশ চ্যানেলের বিপজ্জনক পারাপার সত্যিই কমাতে পারবে।




