একঝাঁক সিইও নিয়ে ওয়াশিংটন যাচ্ছেন শি জিনপিং

শি জিনপিং। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তার সঙ্গে থাকবেন একঝাঁক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বার্তা দিতেই তার এই উদ্যোগ।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সাধারণত বিদেশ সফরে করপোরেট নির্বাহীদের বড় দল সঙ্গে নেন না শি। ২০২০ সালে প্রযুক্তি, শিক্ষা ও আবাসন খাতে চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের পর অনেক ব্যবসায়ীই সরকারের রোষানলে পড়েন। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘চীনা প্রধান নির্বাহীদের কোনো প্রতিনিধি দল আসা সম্পর্কে হোয়াইট হাউসের কাছে তথ্য নেই।’ তবে তথ্য নেই বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেননি তিনি।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের শীর্ষ বৈঠককে সামনে রেখে শির ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নেওয়ার পরিকল্পনার কথা এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ওই দলে কোন কোন ব্যবসায়ী থাকবেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে চীনের আগ্রহের বার্তা দেওয়া। একই সঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হোয়াইট হাউসকে সম্ভাব্য কিছু অর্থনৈতিক সাফল্য দেখানোর সুযোগও দিতে পারে এই উদ্যোগ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নজরদারি বেড়েছে।
চীন থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিদেশি ড্রোন, রাউটার ও রোবট আমদানিতেও দিয়েছে নিষেধাজ্ঞা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম বিক্রি করে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি বিবেচনায় চীনের বড় কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় শি জিনপিং বড় একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল সঙ্গে নিয়েছিলেন। ওই দলে ছিলেন আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা, টেনসেন্টের প্রতিষ্ঠাতা পনি মা এবং চীনা ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সেই সফরে চীন ৩০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩৮ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করে। এ ছাড়া শি জিনপিং অ্যাপলের টিম কুক, মেটার মার্ক জাকারবার্গ ও অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে চীন সফর করেছেন। ২০১৭ সালে এবং চলতি বছরের মে মাসে তার সফরে মার্কিন ব্যবসায়ীরা ছিলেন। এসব সফরের লক্ষ্য ছিল চীনের বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার বাড়ানো।
চলতি বছরের মে মাসে ১৮ জন মার্কিন ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে চীন সফর করেন ট্রাম্প। তাদের মধ্যে ছিলেন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং ও টেসলার ইলন মাস্ক।
চীনা ব্যবসা বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কর্মকর্তা স্কট কেনেডি বলেছেন, ‘চীনারা এবার ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি দলে যুক্ত করার বিষয়টি আরও পরিকল্পিতভাবে করতে পারে।’ তার মতে, বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তুলনা করে কেনেডি বলেন, সেই দলটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে গঠন করা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা সেখানে মূলত নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন, সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর মতো নয়।
এই প্রতিবেদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছরে দুই দেশের নেতাদের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি তারা।
প্রতীকী শীর্ষ বৈঠক
মে মাসে দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক কিছু ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেয়। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি আলাদা সূত্র জানিয়েছে, চীনা বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিবেশ কঠিন। তাই শীর্ষ বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তি বা উল্লেখযোগ্য ফলাফল আসার সম্ভাবনা কম।
সূত্রগুলো বলেছে, শীর্ষ বৈঠক নিয়ে প্রত্যাশাও সীমিত। বড় ধরনের কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা খুব বেশি নেই।
দুই দেশের মধ্যে কোন পণ্যগুলোকে গুরুত্বহীন পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। আলোচনায় প্রায় ১০ ধরনের পণ্যকে গুরুত্বহীন পণ্যের তালিকায় রাখার বিষয়টি রয়েছে। তবে বৈঠকের আগে এ তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে।
বাণিজ্য বোর্ড নিয়ে সমঝোতা চায় যুক্তরাষ্ট্র
বৈঠকে বাণিজ্য বোর্ড নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আরও বেশি বিরল মাটি বা রেয়ার আর্থ রপ্তানির অনুমতিও চায় ওয়াশিংটন।
শীর্ষ বৈঠকে বাণিজ্য বোর্ড নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আরও বেশি বিরল মাটি বা দুর্লভ খনিজ রপ্তানির অনুমতিও চায় ওয়াশিংটন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে করা আগের চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ওয়াশিংটন এখনও চাপ দিয়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে করা ওই চুক্তির মাধ্যমে এক বছরের জন্য বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এতে কিছু রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও শুল্ক স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি দুই দেশের আরও কিছু দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানের বিষয়ও ছিল।
চীন আরও শুল্ক ছাড়ের দাবি জানিয়ে আসছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত জুলাইয়ে জানিয়েছিল, দুই দেশ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক কমানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় চীনের ওপর আরোপ করা কিছু শুল্ক বাতিল করে। এরপর ওয়াশিংটন বিশ্বজুড়ে আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশ কৃষি ও অশুল্ক বাণিজ্য বাধা নিয়ে কিছু ঘোষণা দেবে। তবে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লাইফেং সেপ্টেম্বরের শুরুতেই শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাব্য চুক্তি ও ফলাফল নিয়ে আলোচনা করবেন।
রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে চারটি সূত্র। তবে বৈঠকের সঠিক তারিখ ও স্থান এখনো জানা যায়নি।







