কানাডায় অভিবাসনে কড়াকড়ি
- দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীরা

মার্ক কার্নি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই কানাডার অভিবাসন নীতিতে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে।
উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায় যাওয়া এবং সেখানে স্থায়ী হওয়া অনেকের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কানাডায় পাড়ি দেন বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ। বিশেষ করে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশিসহ বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ কানাডায় আসেন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার প্রতিটি দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে আশ্রয় প্রার্থী হয়েছেন।
মার্ক কার্নি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই কানাডার অভিবাসন নীতিতে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে। একসময় তুলনামূলকভাবে উদার বলে পরিচিত দেশটি এখন ভিসা, আশ্রয় আবেদন এবং দেশে থাকার বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর। সেই কড়াকড়ির চাপ পড়ছে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওপর, আর উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে।
তবে বাংলাদেশিদের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হল তাদের মামলা নানা জটিলতা তৈরি করছে। কানাডার আইন ও নতুন আসার পর ভাষা দক্ষতা না থাকা ও ল ফার্ম নাম দিয়ে নানা প্রতিষ্ঠানের দালালের খপ্পরে পড়ার কারণে অনেকে বিপদের মুখে পড়ছেন। এসব ল ফার্মগুলো একই ঘটনা দিয়ে একাধিক ব্যক্তির নামে মামলা(কপি) দেখিয়েছে। প্রতিটি মামলায় একজন ব্যক্তির কাছ থেকে ৮-থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়েছে তারা। এখান থেকে দালালরা পেয়েছে ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার। এছাড়া কিছু বৈধ্য বাংলাদেশি আইনজীবীর ল ফার্ম রয়েছে যারা এতো বেশি গ্রাহক নিয়েছে যে সেগুলো ভালো করে দেখাও তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
৪৫ বছর বয়সী মন্জুর (ছদ্মনাম) বাংলাদেশে থেকে তার পরিবার নিয়ে কানাডায় এসে এসাইলাম (আশ্রয়) বা রিফিউজি প্রটেকশন দাবি করেছেন। তার এসাইলেম আবেদন বাতিল হয়েছে কিন্তু তার আইনজীবী কিছুই জানাননি। নিয়ম অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে তাকে আপিল আবেদন করতে হয়। সেটি না করলে আশ্রয়প্রার্থীদের ডিপোর্টেশন দিয়ে দেয় অর্থাৎ নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। চিঠি দিয়ে তাকে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির দেখা করতে বলে। সেখানে যাওয়ার পর তাকে আটক করে এবং পরিবারকে দুদিন সময় দেয় সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আসতে তাদের দেশে ফেরত যেতে হবে। এক মূহূর্তেই যেন সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় পরিবারটির। এরকম একাধিক ঘটনা বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির সর্বশেষ হিসাবে, দেশটি থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। একই সঙ্গে আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ে কড়াকড়ি বাড়ছে এবং বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমও দ্রুততর হচ্ছে।
সিবিএসএর হিসাবে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ৯৬৮ জন বাংলাদেশি। সংস্থাটির ভাষায় তারা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াধীন শ্রেণিতে রয়েছেন। কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে বাকি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করা হচ্ছে। একই সময়ে সব দেশ মিলিয়ে এই শ্রেণিতে রয়েছেন মোট ৪০ হাজার ৮২৭ জন বিদেশি নাগরিক। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬২২টি মামলা রিফিউজি ক্লেইম-সংক্রান্ত।
বাংলাদেশিদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসেই ২২৭ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সংখ্যাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২০ সালে পুরো বছর মিলিয়ে এই সংখ্যা ছিল ৩০৮। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর সংখ্যা ২০২০ সালের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশে পৌঁছে গেছে।
কানাডা যে সামগ্রিকভাবেই ফেরত পাঠানোর গতি বাড়িয়েছে, সেটিও সংখ্যায় পরিষ্কার। ২০২৪ সালে দেশটি ১৭ হাজার ৩৯৭ জন বিদেশিকে ফেরত পাঠায়। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৬০ জনে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ১০ হাজার ৬০৭ জনকে। সিবিএসএ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৪০০ জন এমন বিদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যাঁদের কানাডায় থাকার আইনি অনুমতি নেই বা যাঁরা দেশটিতে থাকার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। এই কার্যক্রম জোরদার করতে সরকার ৩০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ চিত্রটি পাওয়া যায় কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডের পরিসংখ্যানে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ১৭ হাজার ২৩৯টি রিফিউজি ক্লেইম শরণার্থী সুরক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। ওই বছর নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ৭৫০টি গ্রহণ করা হয় এবং ১৭৫টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৫ সালে নতুন করে পাঠানো দাবি নেমে আসে ৪ হাজার ৭০টিতে। সে বছর ১ হাজার ২০৩টি দাবি গ্রহণ করা হলেও ৮৬৭টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৪৭টি নতুন দাবি জমা পড়ে। একই সময়ে ২৪৮টি গ্রহণ করা হয় এবং ২৯৩টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৯ হাজার ৯৭২টি দাবি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশিদের শরণার্থী দাবির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমছে। শুধু গৃহীত ও প্রত্যাখ্যাত সিদ্ধান্ত ধরলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সিদ্ধান্ত পাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশের দাবি গৃহীত হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই হার নেমে আসে প্রায় ৫৮ শতাংশে। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তা আরও নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৪৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের প্রতি কানাডার দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়ে উঠেছে।
কানাডার নীতিতেও এ সময় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে আইনে পরিণত হওয়া সি-১২ নম্বর বিল আশ্রয় ব্যবস্থায় নতুন শর্ত যোগ করেছে। ২৪ জুন ২০২০-এর পর প্রথমবার কানাডায় প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে কেউ আশ্রয় দাবি করলে, ৩ জুন ২০২৫ বা তার পর করা সেই দাবি সাধারণ নিয়মে আর অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডে পাঠানো হবে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্থলসীমান্তের নির্ধারিত প্রবেশপথের বাইরে ঢুকে ১৪ দিন বা তার বেশি সময় পরে আশ্রয় চাইলে সেই পথও কঠিন হয়ে গেছে। অর্থাৎ আশ্রয় আবেদনকে ঘিরে আগের অনেক ফাঁকফোকর বন্ধ করার দিকেই এগিয়েছে কানাডা।
কানাডার সরকারি নথি বলছে, ২০২৪ সাল থেকেই যেসব দেশ থেকে ভিসার অপব্যবহার, ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা কানাডায় পৌঁছে পরে আশ্রয় দাবির প্রবণতা বেশি বলে চিহ্নিত হচ্ছিল, সেসব দেশের আবেদন আরও কড়া যাচাইয়ের মধ্যে আনা হয়। ওই তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়ার নামও রয়েছে। নতুন ঝুঁকি সূচক, গোয়েন্দা তথ্য এবং কর্মকর্তাদের জন্য বাড়তি নির্দেশনার কারণে ভিসা যাচাই এখন আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়েছে।
সাম্প্রতিক ফুটবল বিশ্বকাপও এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট অনুমোদন নিয়ে কানাডায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ১৭৫ জন পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি। আরও বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশিদের মাত্র ৪৫টি ভিজিটর ভিসা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সংখ্যাটি বড় নয়, কিন্তু এই তথ্য দেখাচ্ছে যে সাময়িক ভ্রমণের সুযোগ নিয়েও কেউ কেউ স্থায়ী থাকার পথ খুঁজেছেন। ফলে বাংলাদেশিদের আবেদন নিয়ে কানাডার কর্তৃপক্ষের সন্দেহ ও কড়াকড়ি আরও বেড়েছে।
মিথ্যা তথ্য, একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির মামলা (কপি) সাজানো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ভিত্তিহীন আশ্রয় দাবির পথ ধরে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা এখন শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, তা বৈধভাবে বিদেশে যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তথ্যসূত্র: কানাডা বর্ডার সার্ভিস এজেন্সি, ইমিগ্রেশন এন্ড রিফিউজি বোর্ড অব কানাডা







