চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নিজের সন্তানকে বিক্রি করেছিলেন মারুফ, কী লেখা তাতে

আইফোন হাতে অভিযুক্ত মারুফ ও চুক্তিপত্র
পটুয়াখালীর দশমিনায় আইফোন কেনার শখ পূরণ করতে গিয়ে নিজের দেড় বছরের শিশুকে ১ লাখ টাকায় অন্যের কাছে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত ওই বাবার নাম মো. মারুফ মুন্সি। তিনি ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে এবং পেশায় কাঠমিস্ত্রি।
এ ঘটনায় সামনে এসেছে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা একটি চুক্তিপত্র। নথিতে প্রথম পক্ষ হিসেবে মো. মারুফ (২২) এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে মো. ইমরান (২৮)-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিপত্রে শিশু জাহিদুল ইসলাম মুসাকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে ‘দত্তক’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তিপত্রের শুরুতে প্রথম পক্ষ মো. মারুফ তার শিশু সন্তানের পরিচয় তুলে ধরেছেন। নথিতে শিশুটির নাম জাহিদুল ইসলাম মুসা, জন্মতারিখ ১১ মে ২০২৫ এবং বয়স ১ বছর ৩ মাস ১৯ দিন উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে উল্লেখ রয়েছে, মারুফের স্ত্রী তাকে না জানিয়ে চলে গেছেন এবং তার অবস্থান সম্পর্কে নিকট আত্মীয়রাও কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এ কারণে শিশুটিকে লালন-পালন ও সেবা-যত্ন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ‘তাই আমি আমার সন্তান জাহিদুল ইসলাম মুসাকে দ্বিতীয় পক্ষ মো. ইমরানের (২৮) নিকট এক লাখ টাকার বিনিময়ে দত্তক প্রদান করলাম।’
নথিতে আরও লেখা হয়েছে, চুক্তিপত্রের মাধ্যমে প্রথম পক্ষ সন্তানকে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে দত্তক দেওয়ার পর প্রথম পক্ষ, তার ভবিষ্যৎ ওয়ারিশ কিংবা অন্য কেউ কোনো কারণে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে দাবি-দাওয়া করতে পারবেন না। কেউ দাবি করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
চুক্তিপত্রের শেষাংশে বলা হয়েছে, প্রথম পক্ষ সজ্ঞানে ও সুস্থ মস্তিষ্কে, কারও অনুরোধ বা প্ররোচনা ছাড়াই দ্বিতীয় পক্ষের কাছে শিশু জাহিদুল ইসলাম মুসাকে দত্তক দিয়েছে।
চুক্তিপত্রে দুই পক্ষের স্বাক্ষরের পাশাপাশি সাক্ষীদের স্বাক্ষরের জন্যও জায়গা রাখা হয়েছে। নথিটির সঙ্গে শিশুটিকে কোলে নেওয়া অবস্থায় একটি ছবিও সংযুক্ত রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক কলহের জেরে প্রায় এক মাস আগে মারুফের স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে যান। গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমের কাছ থেকে ছেলে মুসাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বের হন।
সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও মারুফ ও মুসা বাড়িতে না ফেরায় স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, মারুফ তার ছেলে মুসাকে আলীপুর ইউনিয়নের রামনাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে ১ লাখ টাকায় দিয়ে দিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শিশুটিকে দেওয়ার পর পাওয়া টাকা দিয়ে একটি আইফোন কিনেছেন মারুফ।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শিশুটিকে উদ্ধারে দ্রুত তৎপর হয় দশমিনা থানা পুলিশ।
পরদিন রবিবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত মারুফ মুন্সিকে আটক করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইমরান হোসেনকে থানায় ডেকে আনা হয়। রাত ১০টার দিকে গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস এলাকা থেকে শিশু মুসাকে উদ্ধার করে পুলিশ।
এরপর দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান ও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে শিশুটিকে তার দাদা মফিজ মুন্সি ও দাদি মাহফুজা বেগমের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার পর শিশু মুসার ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে দশমিনা উপজেলা প্রশাসন। তার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউএনও মো. মাহমুদ হাসান জানান, শিশু মুসার ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে তার নামে ব্যাংক হিসাব খোলাসহ দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সুধীজনের সহযোগিতায় তার জন্য একটি তহবিল গঠনের কাজ চলছে।









