হিমালয়ের বার্তা ও আমাদের প্রস্তুতি

হিমালয় পর্বতমালাকে বহুকাল ধরে আমরা চিনে এসেছি এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’ বা পরম শ্রদ্ধার ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে। কিন্তু আজ সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্তাপ বৃদ্ধি আর আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতায় সেই হিমালয়ের বরফ গলছে অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো। সেই দূর পাহাড়ে বরফ গলার নীরব ক্রন্দন গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও ত্রিশূলির জলস্রোত বেয়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমতলে ধেয়ে আসছে অনিশ্চয়তা আর বিপর্যয়ের বার্তা হয়ে।
২০১১-২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে হিন্দু কুশ-হিমালয় অঞ্চলে বরফ গলার গতি তার আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, আমরা যদি বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের চেয়ে মাত্র দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে পারি, তবুও এই শতকের শেষভাগে হিমালয়ের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
প্লাবন ও মরূকরণের টানাপড়েন
বাংলাদেশ মূলত একটি গতিশীল ও পললঘটিত বদ্বীপ, যার প্রাণপ্রবাহ টিকে রয়েছে নদী ব্যবস্থার ওপর। যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর ধমনি যুক্ত রয়েছে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর সঙ্গে, যার মধ্যে ৫৪টি ভারত থেকে এবং তিনটি মিয়ানমার থেকে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রতি বছর প্রবাহিত মোট পানির ৯২ শতাংশই সীমান্ত পেরিয়ে উজান থেকে আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এর বিশদ বিশ্লেষণেও উন্মোচিত হয়েছে উজান-ভাটির এ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের জলবায়ুগত ঝুঁকি কতটা সংবেদনশীল। উজানের পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ বর্ষণ বা হিমবাহের পানি উপচে পড়লে আমাদের নদীগুলো মুহূর্তের মধ্যে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা কিংবা তিস্তা অববাহিকায় কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই যে ক্ষিপ্র ও বিনাশী আকস্মিক ঢল আঘাত হানে, তা মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
উল্টোদিকে, শুষ্ক মৌসুমে উজানে কৃত্রিম ব্যারাজ বা একতরফা পানি প্রত্যাহারে আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়। বর্ষার অতিপ্লাবন আর শীতের মরূকরণ— এ দুই চরম বৈপরীত্যের চাকায় পিষ্ট হয়ে বদ্বীপের জনজীবন আজ এক গভীর সংকটে নিপতিত।
পুনর্গঠনের পথনকশা
পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে এ সংকট থেকে উত্তরণের একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। অষ্টম ও পূর্ববর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোর অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এর দূরদর্শিতাকে ভিত্তি করে তৈরি জাতীয় নীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে থ্রি আর (Recovery, Restoration, Reconstruction) কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১) আমাদের জলবায়ু ও পানিসম্পদ খাতকে পুনর্গঠনে সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক এজেন্ডা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম বছরে (রিকভারি) অতি ঝুঁকিপূর্ণ নদীগুলোর ক্যাচমেন্ট ড্রেজিং, বেড়িবাঁধের দ্রুত সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সংকটকালীন সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় বছরে (রেস্টোরেশন) উজান ও ভাটির নদীর স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা পরিবেশগত প্রবাহ পুনরুদ্ধার, ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ এবং একটি সমন্বিত রিয়েল টাইম হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ স্থান পেয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে (রিকনস্ট্রাকশন) জলবায়ু-সহনশীল টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রকৃতিবান্ধব প্রকৌশল বা ইকো-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডেল্টাপ্ল্যান ২১০০-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোকে সুনির্দিষ্ট বাজেটের আওতায় বাস্তবে রূপ দেওয়ার কৌশল চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নীতি, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
আমাদের সংবিধানে ১৮(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাষায় বলা আছে— বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্র পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জঙ্গল ও জলাভূমির নিরাপত্তা বিধান করবে। এই সাংবিধানিক দায়িত্বের ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে দেশের ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ (NAP 2023-2050)।
ন্যাপে চিহ্নিত ১১৩টি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হলো গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকায় সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। একই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘে উপস্থাপিত আমাদের ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান’ (NDC3.0) নথিতে জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং পানিব্যবস্থাপনা খাতের অভিযোজন কৌশলকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
ভুটান ও নেপালে হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণের জন্য যেভাবে আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি ও ড্রোন মনিটরিং শুরু হয়েছে, সে প্রযুক্তিগত সুবিধা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে প্রসারিত করা সময়ের দাবি
এ প্রশাসনিক পরিকল্পনার পাশাপাশি আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবেশ ও নদী নিরাপত্তার বিষয়টি এখন সর্বাগ্রে স্থান পাচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও জাতীয় সংস্কার ভাবনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পানি আইনের আওতায় বাংলাদেশ তার নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সোচ্চার হবে।
একই সঙ্গে উজানের দেশগুলোর সঙ্গে পানিপ্রবাহ ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত তথ্যের আদান-প্রদান চুক্তি সম্পাদন এবং তিস্তা ও গঙ্গার মতো প্রধান নদীগুলোর নাব্য রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জোরালো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রূপরেখা (২০২৬-৩১), ন্যাপ, এনডিসি এবং রাজনৈতিক ইশতেহারের এ অভিন্ন সুর প্রমাণ করে, হিমালয় সংকট ও বন্যা মোকাবিলা আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নীতিগত জাতীয় ঐকমত্যে পরিণত হয়েছে।
জল-কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
যেহেতু নদী কোনো ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা মানে না, তাই এ সংকটকে কোনো একটি দেশের মধ্যে আবদ্ধ রেখে সমাধান করা অসম্ভব। ইউরোপীয় অঞ্চলের নদীব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে আমরা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। রাইন ও দানিউব নদীর অববাহিকায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যেভাবে যৌথ দুর্যোগ পূর্বাভাস, পরিবেশগত ডেটা-শেয়ারিং ও সমন্বিত অববাহিকা পরিষদ গঠন করে কাজ করছে, তা আজ বিশ্বের অন্যতম সফল অববাহিকা ব্যবস্থাপনার মডেল। একইভাবে আমাদের প্রতিবেশী ভুটান ও নেপালে হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণের জন্য যেভাবে আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি ও ড্রোন মনিটরিং শুরু হয়েছে, সে প্রযুক্তিগত সুবিধা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে প্রসারিত করা সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের আইনি অবস্থান তুলে ধরতে জাতিসংঘ ১৯৯৭ সালের ‘আন্তর্জাতিক ওয়াটারকোর্স কনভেনশন’কে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এই কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৭ এবং ৪-এ পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, কোনো উজানের দেশ এমন কোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা পানি প্রত্যাহার করতে পারবে না, যা ভাটির দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য বা জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর হয়। ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত পাওয়া কিংবা সীমান্তপাড়ের রিয়েল টাইম হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা লাভ করা কোনো আন্তর্জাতিক অনুদান বা করুণা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক আইনি ও মানবাধিকারভিত্তিক অধিকার।
আগামীর বদ্বীপ: আশার আলোয় নতুন দিন
হিমালয়ের বরফ গলার খবর কিংবা উজান থেকে ধেয়ে আসা নদীপ্লাবন নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কিন্তু হাজার বছর ধরে এই বদ্বীপের মানুষ প্রকৃতির বৈরী আচরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার অনন্য শিল্প আয়ত্ত করেছে। আজ আমাদের শুধু সাময়িক প্রতিকার বা বাঁধ বাঁধার সনাতনী চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কৃত্রিম ও ব্যয়বহুল সিমেন্ট-কংক্রিটের নদীশাসনের বদলে আমাদের জোর দিতে হবে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে নদীকে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল।
আমাদের হাতে রয়েছে বিজ্ঞানের অকাট্য তথ্য, রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক (২০২৬-৩১)’-এর সুনির্দিষ্ট থ্রি আর নির্দেশিকা, ন্যাপ ও এনডিসি ৩.০-এর কৌশলগত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুদৃঢ় সদিচ্ছা। জাতীয় নিরাপত্তা চিন্তাকে শুধু সামরিক শক্তি বা সীমান্ত প্রহরায় সীমাবদ্ধ না রেখে যদি আমরা আন্তঃসীমান্ত পরিবেশগত কূটনীতি, রিয়েল টাইম প্রযুক্তিগত ডেটা বিনিময় এবং স্মার্ট নদী ড্রেজিংয়ে অর্থায়ন করতে পারি, তবে হিমালয়ের চূড়া থেকে নেমে আসা জলধারা আর আমাদের আতঙ্কের কারণ হবে না।
লেখক: উন্নয়নকর্মী








