আসিয়ান-মিয়ানমার সম্পর্ক কোন পথে

থাইল্যান্ডে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক- রয়টার্স
প্রতিবেশী মিয়ানমারে সবশেষ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে ২০২১ সালে। ক্ষমতা হারান গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সুচি। সেই থেকে দেশটি নিষিদ্ধ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান দেশগুলোর জোট আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনে। জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আসিয়ানের সমকক্ষদের সঙ্গে মুখোমুখি কোনো বৈঠক করতে পারেননি এতদিন। প্রায় পাঁচ বছর পর গতকাল রবিবার জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রথমবার সামনাসামনি বৈঠকে বসেছেন জান্তা মনোনীত পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বৈঠককে সামান্য কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি বলে দাবি করেছেন আয়োজকরা। তবে এই দাবিতে আশ্বস্ত হতে পারেননি উপস্থিত সাংবাদিকরা। বৈঠক শেষে মিয়ানমার-আসিয়ান সম্পর্কের সংশয় যেন থেকেই গেল।
বৈঠকের প্রধান দুই মধ্যস্থতাকারী ছিলেন আসিয়ানের বিশেষ দূত ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া থেরেসা লাজারো এবং থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও। সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন তারা।
সাংবাদিকেরা জানতে চান, আসিয়ান কেন এখনো এমন একটি ‘পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ আঁকড়ে ধরে আছে যা খোদ মিয়ানমারের সংসদই প্রকাশ্যে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেবিলে ফিরিয়ে এনে আসিয়ান কোনো বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে কি না এবং আসিয়ান যে ‘দৃশ্যমান অগ্রগতির’ কথা বলছে, তা যাচাইয়ের কোনো সময়সীমা আছে কি না ইত্যাদি। তবে কোনো প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। আসিয়ানের এই আশাবাদ এবং মিয়ানমারের অগ্রগতি ঠিক কতদিনের মধ্যে মূল্যায়ন করা হবে সেটা স্পষ্ট নয়। তাই বড় ধরনের সংশয় রয়ে গেছে। এই ফাঁকটিই নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
কূটনৈতিক দিক থেকে রবিবারের বৈঠকটি ছিল বেশ জটিল ও বহুমাত্রিক। দুটি অংশের বৈঠকের প্রথমটি ছিল আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ তিন মং সোয়ের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক। আর দ্বিতীয়টি ছিল মিয়ানমার সংকট নিয়ে আসিয়ানের বাকি সদস্যদের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ সভা। আসিয়ানের ১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ১০ দেশই এই বৈঠকে অংশ নেয়।
থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্তরের প্রতিনিধি পাঠালেও, মালয়েশিয়া পাঠায় তাদের সিনিয়র অফিসিয়াল সেক্রেটারি-জেনারেলকে। আর কম্বোডিয়া এই বৈঠক সম্পূর্ণ বয়কট করে কোনো প্রতিনিধিই পাঠায়নি।
বিশেষ দূত মারিয়া থেরেসা লাজারো বলেছেন, ‘২০২১ সালের ঘটনার পর এই প্রথম আমরা মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে সামনাসামনি বসেছি।’ তিনি জানান, বৈঠকে শান্তি প্রক্রিয়া, অং সান সু চিকে কারাগার থেকে নির্দিষ্ট সরকারি বাসভবনে স্থানান্তর এবং আন্তঃসীমান্ত সাইবার স্ক্যাম, মানব পাচার ও মাদক পাচার রোধে সহযোগিতার বিষয়ে বিস্তৃত ব্রিফিং দিয়েছে নেপিদো।
থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক স্পষ্ট করেছেন, বৈঠকটি আসিয়ানের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন নয়, বরং কৌশলের বিবর্তন মাত্র। ‘নিয়ন্ত্রিত ও ধাপে ধাপে যোগাযোগ রক্ষা করার নীতি মেনে চলে থাইল্যান্ড। আমরা সবাই পাঁচ দফা ঐকমত্যের প্রতিশ্রুতিতে জোর দিয়েছি। তবে মূল বিষয় হলো ৫ দফা বাস্তবায়নের কৌশল কী হবে,’ বলছিলেন সিহাসাক।
একই সঙ্গে তিনি নেপিদো এবং আসিয়ানের বাকিদেরও সতর্ক করে বলেছেন, ‘যোগাযোগের এই নীতি কিন্তু একমুখী রাস্তা নয়। আসিয়ান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ দূর করতে মিয়ানমারকেও এগিয়ে আসতে হবে।’
এই দীর্ঘ বৈঠক থেকে যদি কোনো বাস্তব ফলাফল এসে থাকে তা হলো লাজারোর একটি ঘোষণা। তিনি জানান, চলতি বছরের দ্বিতীয় ভাগে তিনি আসিয়ানের ত্রাণ সংস্থা ‘এএইচএ সেন্টার’, মানবিক সহায়তাকর্মী এবং আসিয়ানের উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারে মানবিক মিশনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে আরও বেশি সাহায্য পৌঁছাতে চান।
লাজারো এবং সিহাসাক দুজনেই একে অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে দাবি করেছেন। এর আগে যেসব এলাকায় মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল সেখানেও যাওয়ার অনুমতি দিতে রাজি। বিষয়টি উল্লেখ করে লাজারো বলেছেন, ‘এটি ইতোমধ্যেই এক ধরনের অগ্রগতি। বললেই তো আর সব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।’
এই মানবিক মিশন ছাড়াও আসিয়ানের পক্ষ থেকে আগের চারটি শর্তই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে— মানবিক সহায়তার পরিধি বাড়ানো, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতা কমানো, সব পক্ষের অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংলাপ এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিসহ অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। সিহাসাক আরও জানান, থাইল্যান্ড তাদের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংলাপের পথ তৈরি করতে কাজ করছে। তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
কূটনীতির আড়ালে চাপা পড়া পুরনো সংশয়
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তোলা সংশয়গুলো মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ছিল। কোনোটিরই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রতিনিধিরা দিতে পারেননি। প্রথমত, পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো। জবাবে লাজারো বলেছেন, ‘তারা এটি প্রত্যাখ্যান করুক বা না করুক, আমি এবং আসিয়ান এই পাঁচ দফা ঐকমত্যের পেছনে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছি।’
অন্যদিকে সিহাসাক নীতির চেয়ে কৌশলের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, থাইল্যান্ড এই ঐকমত্যের কথা বারবার না বলে তা বাস্তবায়নের উপায় খুঁজছে।
দ্বিতীয় সংশয়টি ছিল নজির স্থাপন নিয়ে। আসিয়ানের বিশেষ দূতকে অং সান সু চির সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অনুমতি দেয়নি জান্তা সরকার। অথচ জান্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বৈঠকে ডেকে আসিয়ান সেই আইন না মানা আচরণকে পুরস্কৃত করল কি না। লাজারো এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন। তার ভাষ্য, ২০২১ সালে এই সংকট শুরু হওয়ার পর এই প্রথম তাদের সঙ্গে বসা গেছে। এটি কোনো ছাড় নয় বরং একটি প্রক্রিয়ার শুরু।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ছিল জবাবদিহিতা নিয়ে। আসিয়ানের বেঁধে দেওয়া শর্তগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় মিয়ানমার আসলেই তা বাস্তবায়ন করছে কি না তা কীভাবে বোঝা যাবে? এই প্রশ্নে দুই কর্মকর্তাই পরোক্ষভাবে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেন। লাজারো বলেছেন, ‘পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল, আমরা কোনো তারিখ নির্ধারণ করতে পারি না। অনেক সময় চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়াটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
আর সিহাসাকের ভাষ্য, ‘দেশটিতে বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না আমরা তা পর্যালোচনা করব।’ তবে এই পর্যালোচনার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা তিনি বলতে পারেননি।
মনিটর গ্রুপ এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের এই গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যে ১ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রবিবারের এই বৈঠক কি আসলেই বরফ গলার শুরু, নাকি পাঁচ বছরের স্থবির সম্পর্ক নতুন করে সেট করা হলো তা বছর শেষ হওয়ার আগেই প্রমাণ হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং এর পরবর্তী সম্মেলনগুলোতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আসিয়ান নেতারা চলতি বছরের শীর্ষ সম্মেলনকেই সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন যেখানে বিচার করা হবে নেপিদো শুধু মুখের কথায় নাকি আসলেই কোনো বাস্তব অগ্রগতির পথে হাঁটছে।










