উপেক্ষিত রোহিঙ্গারা, পোক্ত হবে সেনাশাসন
সংবিধানে ৪৩ পরিবর্তনের ঘোষণা মিয়ানমার জান্তা প্রেসিডেন্টের

মিয়ানমারের জান্তা প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং- রয়টার্স
মিয়ানমারের সংবিধানে অন্তত ৪৩টি পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির জান্তা প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। গত মঙ্গলবার দেশটির ইউনিয়ন পার্লামেন্টে পাঠানো এক বার্তায় ২০০৮ সালের সংবিধানে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর তালিকা পেশ করেছেন তিনি। এ তালিকায় গুরুত্ব পায়নি রোহিঙ্গাদের মতো জাতিগত সংখ্যালঘুরা। পাস হলে দেশটিতে আরও পাকাপোক্ত হবে সেনাশাসন।
সামরিক বাহিনীর প্রক্সি দল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (ইউএসডিপি) নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই বার্তাটি গ্রহণ করার কথা নথিবদ্ধ করে। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়া কিংবা এর ওপর কবে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আইনপ্রণেতা বললেন, ‘তারা ঠিক কীভাবে এটি সংশোধন করতে যাচ্ছে তা আমরা এখনো জানি না। ধারণা করা হচ্ছে, তারা এটি পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করবে। কারণ যেকোনো পরিবর্তনই পার্লামেন্টে বিতর্ক ও অনুমোদনের মধ্য দিয়ে আসতে হবে।’
গত অক্টোবরে মিয়ানমার জুড়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তির (এনসিএ) ১০ম বার্ষিকী উদযাপনের সময় মিন অং হ্লাইং দাবি করেছিলেন, জান্তার শান্তি কমিশন এবং অংশীজনরা সংশোধনের জন্য ৪৩টি পয়েন্টে একমত। রাজনৈতিক দলগুলোও একই সংখ্যার কথা উল্লেখ করেছে।
পার্লামেন্টে পাঠানো অভ্যুত্থানকারী প্রেসিডেন্টের নোটে সংশোধনীগুলোকে দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, সংবিধানের ধারা ৪৩৬ (এ)-এর অধীনে থাকা মৌলিক বিধানগুলোর সংশোধনী। যার মধ্যে ৪, ৫, ৮, ১১(এ), ১৯(এ), ২০(এ), ২২(ডি), ২৩(সি), ২৭, ৩০, ৫৩(এ), ৫৯(সি) ও (ডি), ১০৬(এ) ও (বি) এবং ২৪৮(সি) ধারা অন্তর্ভুক্ত। এগুলো পাস করার জন্য ৭৫ শতাংশের বেশি সংসদ সদস্যের অনুমোদন লাগবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী গণভোটের প্রয়োজন হবে। যেখানে মোট ভোটারের অন্তত অর্ধেক অংশের সমর্থন থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ধারা ৪৩৬ (বি)-এর অধীনে থাকা অন্যান্য বিধানের সংশোধনী। যার মধ্যে ৬৪, ১৩৪(এ)(বি), ১৮৮(এ), ২৩২(এ), ২৩৫(বি), ২৩৯(এ), ২৪৪(এ), ২৪৫(বি), ২৫০, ২৬১ (এ), ২৮৬(এ), ২৮৮(এ)(বি), ৩২২(বি)(এইচ), ৩৩১, ৩৩৫, ৩৪২, ৩৭৩, ৪০১(এ), ৪০২, ৪০৩, ৪০৩(এ) ধারা এবং সংশ্লিষ্ট তফসিলগুলো অন্তর্ভুক্ত। এগুলো পাসের জন্য কেবল পার্লামেন্টে ৭৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন।
সামরিক বাহিনী মনোনীত এমপি এবং ইউএসডিপি নিয়ন্ত্রিত আইনসভায় এই পরিবর্তনগুলো সহজেই পাস করানো সম্ভব। উল্লেখ্য, সামরিক বাহিনীর তৈরি করা ২০০৮ সালের সংবিধানে জাতীয় ও উপ-জাতীয় পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন অনির্বাচিত সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, জান্তা সরকার সংবিধানের ৫৯(এফ) ধারার বিধিনিষেধ আরও বাড়াতে চায়। এই ধারার কারণে বিদেশে পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় প্রেসিডেন্ট হতে পারছেন না কারাবন্দী নেত্রী অং সান সু চি। জান্তা এখন এই বিধিনিষেধ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাজ্য বা অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর করতে চায়। এর আগে ২০১৯ সালেও সামরিক বাহিনী মনোনীত আইনপ্রণেতারা একই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
এ ছাড়া জান্তা সরকার কনস্টিটিউশনাল ট্রাইব্যুনাল এবং ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশনের (ইউইসি) মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি সংবিধানে এমন সংশোধন আনা হবে যার ফলে ইউইসির যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যাবে।
অন্যান্য প্রস্তাবিত সংশোধনীর মধ্যে রয়েছে রাজ্য ও অঞ্চলগুলোকে তাদের নিজস্ব সংবিধান তৈরির অনুমতি দেওয়া। তবে শর্ত থাকে তা যেন কেন্দ্রীয় সনদের পরিপন্থী না হয়। এ ছাড়া জনসাধারণের সরাসরি ভোটে জেলা প্রশাসকদের নির্বাচিত করার প্রস্তাবও রয়েছে এতে।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ৪৩টি পয়েন্টের মধ্যে জাতিগত সংখ্যালঘু দলগুলোর দীর্ঘদিনের একটি দাবি অনুপস্থিত রয়েছে। তারা রাজ্য ও অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। যাতে স্থানীয় আইনসভাগুলো নিজেদের মুখ্যমন্ত্রী নিজেরাই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করতে পারে।
৪৩টি পয়েন্টের মধ্যে ৩৪২ নম্বর ধারাও রয়েছে। এটি প্রেসিডেন্টকে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশে সেনাপ্রধান নিয়োগের ক্ষমতা দেয়। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কেবল এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই নিয়োগটি তখনই হবে যখন পদটি শূন্য হবে।
সামরিক বাহিনীর এনসিএ আলোচনা কমিটি, অংশ নেওয়া জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরই এই ৪৩টি পয়েন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো দুইশর বেশি সংশোধনীর প্রস্তাব জমা দিলেও ‘ইউনিয়ন অ্যাকর্ড’ নামক চুক্তির আওতায় মাত্র ৪৩টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।




