পরিকল্পনার গলদে মিলছে না মুক্তি

চট্টগ্রাম শহরের দুই নম্বর এলাকার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
কয়েক দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় জমেছে বুক থেকে কোমরসমান পানি। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেক এলাকার মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছে নিরাপদ স্থানে। বন্ধ হয়ে গেছে ট্রেন চলাচল। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। প্রতি বছরই ঘোর বর্ষায় এ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় বন্দরনগরীকে। অথচ এই জলাবদ্ধতা ঠেকাতে ১২ বছর ধরে চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে চারটি প্রকল্প। যেগুলোর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। যার মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ১১ হাজার ৩২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এরপরও ফি বছর পুনরাবৃত্তি ঘটছে একই দৃশ্যের।
কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এলো পর্যাপ্ত সমীক্ষা-গণশুনানি-আন্তঃসংস্থা সমন্বয় ছাড়াই প্রকল্পগুলো তড়িঘড়ি করে নেওয়ার বিষয়টি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব ঘাটতির সমাধান না হলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও ৭০ লাখ নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ থেকে বাঁচানো যাবে না।
জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের রাজনীতি বা কাদা ছোড়াছুড়ি না করার আহ্বান জানিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বললেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একদিনে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে যেকোনো শহরে বন্যা হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে চট্টগ্রামে এখনো সেই পরিস্থিতি হয়নি। কোনো সংস্থাকে দোষারোপ না করে চসিক, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর একযোগে মাঠে থেকে কাজ করছে।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি চীনা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নাকে দিয়ে একটি সমীক্ষাও করান। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম তাড়াহুড়ো করে খণ্ডিতভাবে প্রকল্পটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। মেগা এ প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে সিডিএ সম্ভাব্য সমীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজই করেনি। ফলাফল, কাজ শুরুর পর ধরা পড়তে থাকে নানা অসংগতি, পাল্টাতে হয় নকশা। সবশেষে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণ।
সবচেয়ে বড় এ প্রকল্পটি সিডিএর হাতে। ২০১৭ সালে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকায়। এরই মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ৬ হাজার ১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। নগরে খাল আছে ৫৭টি, অথচ এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল। বাকি ২১টি খাল রয়ে গেছে প্রকল্পের বাইরে। ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের তৎকালীন সদস্য এ কে এম ফজলুল হকের উপস্থিতিতে সভায় প্রকল্পটির পরিচালক স্বীকারও করেছিলেন, প্রকল্পের শুরুর দিকে সম্ভাব্য যাচাই করা হয়নি।
নবনিযুক্ত সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বললেন, ‘সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ হয়েছে এবং স্লুইসগেট ও রেগুলেটরগুলো পানি নামাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করছে। তবে এত অল্প সময়ে ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত সামাল দেওয়া যেকোনো আধুনিক শহরের জন্যই কঠিন পরীক্ষা।’
এর আগে ২০২১ সালের জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প তদারককারী প্রতিষ্ঠান আইএমইডি সিডিএর এ প্রকল্পটি নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এত বড় প্রকল্পের সম্ভাব্য সমীক্ষা প্রতিবেদনটিও সঠিকভাবে করা হয়নি।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী বলছিলেন, ‘প্রকল্প পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা কমিটি শুরুতে এই বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ ও জমির জটিলতাগুলো হয়তো ঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। কাজ করতে গিয়ে যখন দেখা যায় এটি এত সহজ নয়, তখন কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।’
চসিকের হাতে থাকা দ্বিতীয় প্রকল্প বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননের। ২০১৪ সালে একনেক যখন এই প্রকল্প অনুমোদন করে, তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি, আর এ বিলম্বে ব্যয় বেড়ে যায় পাঁচ গুণ! ২০২২ সালের এপ্রিলে সবশেষ সংশোধনীতে একনেক অনুমোদন দেয় ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আর চার দফা সময় বাড়িয়ে মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুনে। এত সময় লাগার কারণ হিসেবে প্রকল্প পরিচালক ও চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফরহাদুল আলম দুষলেন ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতাকে।
তৃতীয় প্রকল্প সিডিএর। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ। ব্যয় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ২ হাজার ৪৯৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
চতুর্থ ও সবচেয়ে ধীরগতির প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ২০১৯ সালের প্রকল্প তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছিল। প্রকল্প নেওয়ার আগে হয়নি কোনো সমীক্ষা। কাজ শুরুর পরপরই প্রথমে আপত্তি তোলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তা মেটানোর আগেই একে একে বাধা আসে ড্রাইডক, পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, নৌবাহিনী, রেলওয়ে ও সিটি করপোরেশন থেকে। ফলে পাসের তিন বছর পর প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে। ১৮ কিলোমিটার ফ্লাডওয়াল নির্মাণের কথা থাকলেও বাদ দিতে হয়েছে তার ১২ কিলোমিটার।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বললেন, ‘যেকোনো বড় প্রকল্প চূড়ান্ত করার আগে গণশুনানির মাধ্যমে এর অবস্থান, পরিবেশগত প্রভাব এবং অর্থনৈতিক-কারিগরি সম্ভাব্য যাচাই করার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে, যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে।’
হারিয়ে যাওয়া খাল, দখল হওয়া নদীতীর
১৯৬১ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগরে খাল ছিল ৭০টি। এখন টিকে আছে মাত্র ৫৭টি। হারিয়ে গেছে ১৩টি খাল। আর যেগুলো টিকে আছে, এর মধ্যেও অনেকগুলো বিলুপ্তির পথে। ১৯৯৫ সালে হওয়া আরেকটি মাস্টারপ্ল্যানে চারটি নতুন খাল খনন ও পুরনো খাল সংস্কারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। তা উপেক্ষা করেই পরে নেওয়া হয়েছে সোয়া ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোয় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। উল্টো নদীর দুই পাড় দখল হয়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, জলাধার ভরাট করে তৈরি হচ্ছে আবাসিক এলাকা, একের পর এক উঠছে বহুতল ভবন।
নাসার স্যাটেলাইটে ধারণ করা রাতের ছবি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, গত দুই দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। নদীতীরের প্লাবনভূমিতে বাস করা মানুষের মধ্যে বর্তমানে বন্যার ঝুঁকিতে আছেন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিসের ‘জিওকার্টো ইন্টারন্যাশনাল’ সাময়িকীতে ২০২২ সালের ২২ জুন এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলছিলেন, ‘আগে পানির প্রবাহপথে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। ভারী বৃষ্টি হলেও পানি ভাটির দিকে নেমে যেত। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে এখন পানির স্বাভাবিক নিষ্কাশনে বাধা তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি। এটি পুরোপুরি প্রকৌশল ও নকশাগত ব্যর্থতা আর বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব মোর্শেদ বিষয়টির ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বললেন, ‘স্বাভাবিক অবস্থায় বৃষ্টির অধিকাংশ পানি পাহাড়ের ভূগর্ভে ধারণ হয়, বাকি সামান্য অংশ খাল-ঝিরি বেয়ে নদী বা বিলে গিয়ে মেশে। কিন্তু চট্টগ্রামে এখন প্রাকৃতিক বন বা অক্ষত পাহাড় প্রায় নেই বললেই চলে। এ কারণে ভারী বর্ষণ হলে পানি বালু-মাটিসহ ধুয়ে নেমে আসছে, বাড়ছে আকস্মিক বন্যার প্রবণতা।’
এত বিপুল অর্থব্যয়ের পরও নগরের চিত্র পাল্টায়নি। গতকাল বুধবারও পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জে কোমরসমান পানিতে আটকে ছিলেন বাসিন্দারা। লোডশেডিংয়ের মধ্যে জেনারেটরের তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় পানি মাড়িয়ে ফিলিং স্টেশনে ছুটতে হয়েছে কাউকে কাউকে। চকবাজারের অলিগলিতে স্রোতের মতো নেমেছে পানি, বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা ও চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার নিচু বাড়িঘরও তলিয়ে গেছে পানিতে। জলাবদ্ধতার একই ধরনের প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের ট্রেন চলাচলও।




