অবস্থা খারাপের চেয়েও খারাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের সাম্প্রতিক ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল চিত্র উন্মোচিত করেছে। চারপাশের সুউচ্চ দালান আর জিডিপির প্রবৃদ্ধির আড়ালে যে শূন্যতা বিরাজ করছে, তা ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট। উগান্ডা, ঘানা কিংবা কঙ্গোর মতো দেশগুলো এখন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। আমাদের জনপরিসরে ও নীতিনির্ধারণী মহলে প্রায়ই উগান্ডা-ঘানার মতো দেশগুলোকে নেতিবাচক বা তুচ্ছ অর্থে উল্লেখ করা হয়। অথচ পরিহাসের বিষয় হলো, অর্থনৈতিক অনেক সূচকে সেসব দেশের চেয়েও আমাদের পরিস্থিতি এখন নিম্নগামী।
১৭ কোটির বিশাল বাজার আর সস্তা শ্রমের দোহাই দিয়ে আমরা আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি। অথচ ২০২৫ সালে দেশে এফডিআই এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। আপাতদৃষ্টিতে এটি পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি মনে হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এ সংখ্যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমাদের চেয়ে অর্ধেক জনসংখ্যার দেশ উগান্ডা প্রায় দ্বিগুণ (৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ টেনে নিয়েছে। ঘানা এবং কঙ্গোও প্রতিটি ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পেয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। এ চিত্রই প্রমাণ করে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ তার আকর্ষণ দ্রুত হারাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ প্রায় ২৩ শতাংশ কমে গেছে। এর অর্থ পরিষ্কার, বাংলাদেশে নতুন কোনো কারখানা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিদেশিরা আস্থা পাচ্ছেন না। বর্তমানে যেটুকু বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে, তার সিংহভাগই হলো এদেশে থাকা পুরনো কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ। এর মূল কারণ, আমাদের জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং তীব্র গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি দিতে না পারলে কোনো বিনিয়োগকারী এখানে টাকা ঢালবে না। তার ওপর রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যবসা করার উচ্চ খরচ এবং পোর্টের দীর্ঘ লিড টাইম। মুখে আমরা ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বা এক দরজায় সব সেবার কথা বললেও বাস্তবে তা আংশিক এবং অকার্যকর হয়ে পড়ে রয়েছে।
শুধু যে বৈদেশিক বিনিয়োগে খরা চলছে তা-ই নয়, আমাদের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের চিত্রও সমানভাবে শঙ্কাজনক। দেশের মোট স্থাবর মূলধন গঠনের মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ আসছে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে। অর্থাৎ দেশের পুরো অর্থনৈতিক চাকা অভ্যন্তরীণ পুঁজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু স্থানীয় উদ্যোক্তারাও এখন ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা, ডলার সংকট এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগে ভয় পাচ্ছেন। ফলে কলকারখানা সম্প্রসারণ থমকে গেছে, যা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।
বিনিয়োগের এই আকালের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি বলতে গেলে শূন্য। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ ৩৪টি সূচক এখন লাল তালিকায় রয়েছে। এই লাল চিহ্ন আমাদের তীব্র সুশাসনের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক পচনকে নির্দেশ করে। এসডিজি বাস্তবায়নের আর মাত্র চার বছর বাকি থাকলেও আমরা দুর্নীতির লাগাম টানতে পারিনি। ঘুষ, লবিং আর নীতিগত অস্বচ্ছতার কারণে ব্যবসা শুরুর খরচ এখানে আকাশচুম্বী। এই অর্থনৈতিক খরা কাটাতে হলে ফাঁকা বুলি বাদ দিয়ে দ্রুততম সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং লাল তালিকাকে সবুজ করতে হবে। না হলে এদেশ শুধু সস্তা শ্রমের বাজারই থেকে যাবে, উন্নত রাষ্ট্র হতে পারবে না।




