ছুটির ঘণ্টার আগেই শিশুদের মৃত্যুঘণ্টা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টানা তিন দিনে বৃষ্টির তেজ কমলেও ঝরছিল বিরামহীন। এর মধ্যেই গতকাল বুধবার কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি নারী মাদ্রাসা ও হেফজখানায় চলছিল ক্লাস। ছুটি হওয়ার কথা ছিল দুপুর ২টায়। ছোট শিক্ষার্থীরা ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছিল বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিও। অপেক্ষায় ছিল ছুটির ঘণ্টা বাজার। কিন্তু তার আগেই হুড়মুড়িয়ে মাদ্রাসা কক্ষের ওপর ধসে পড়ল পাহাড়। চাপা পড়ল মাদ্রাসা কক্ষে থাকা অন্তত ২৫ শিক্ষার্থী। স্থানীয় লোকজন, ফায়ার সার্ভিস ও সিসিসিএম স্বেচ্ছাসেবকদের চার ঘণ্টার চেষ্টায় জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৪ জনকে। আর মাটির নিচ থেকে টেনে তোলা হয় প্রাণহীন পাঁচ শিশুর দেহ। দিনভর আট শিশুর মৃত্যুর কথা জানানো হলেও রাতে বলা হয় পাহাড়ধসে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই ক্যাম্পের ৩ নম্বর ব্লকের মসজিদুল কুবা নারী মাদ্রাসা ও হেফজখানার এ দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে পুরো ক্যাম্পেই।
এদিকে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল নগরের ষোলশহর মুক্তিযোদ্ধা পাহাড় ও সীতাকুণ্ড থানাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় মারা যায় ওই দুই শিশু।
এর আগে গত সোম ও মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল।
আষাঢ়ের শেষ দিকে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বর্ষণের কবলে দেশ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে দেখা দিয়েছে অস্থায়ী বন্যা পরিস্থিতি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে ভয়াবহ। ওই অঞ্চলে সড়ক ও রেলপথ ডুবে বিঘ্ন ঘটেছে যোগাযোগে।
এদিকে, টানা বর্ষণের প্রভাবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী পাঁচ দিন সারা দেশেই বৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়াবিদদের তথ্যমতে, পূর্ব মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বিরাজ করছে।
এ ছাড়া মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ রাজস্থান, লঘুচাপের কেন্দ্রস্থল, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিন এসব এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী এবং পরবর্তী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন এবং সিসিসিএম স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত অভিযানে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে মাটিচাপা পড়া ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে ছয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে এপিবিএন সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং আরআরআরসি কার্যালয় উদ্ধার ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা তদারকি করছে।
ক্যাম্প প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত পাঁচজন নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন শাহিদা (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), ওমাইচা বিবি (১৩) ও রাশিদা (১৬)।
নিহত শাহিদা ক্যাম্প-৩-এর জি/৮৩ ব্লকের বাসিন্দা। তার বাবা সামশুল আলম। উম্মে নেজাতুল ও উম্মে সালমা সম্পর্কে দুই বোন। তারা ক্যাম্প-৩-এর এফ/১ ব্লকের বাসিন্দা আব্দুস শুক্কোরের মেয়ে। ওমাইচা বিবি ক্যাম্প-৫-এর এ/৮ ব্লকের মো. ইলিয়াছের মেয়ে এবং রাশিদা ক্যাম্প-৫-এর এ/১১ ব্লকের হাসেম উল্লাহর মেয়ে। বাকি তিন নিহতের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে ক্যাম্প প্রশাসন। তবে রাতে বলা হয়, পাহাড়ধসে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছে আসরা (৯), বেগম জান (১৫), ফারেসা বিবি (১২), জান্নাত আরা বিবি (৮), নূর ফাতেমা (১০), নুর সেহেরা (১২), আব্দুল মোনাফ (১৭) ও নূর কায়েস (১০)। এর মধ্যে আসরা ও ফারেসা বিবিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। জান্নাত আরা বিবি ও নূর কায়েস ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতালে এবং নুর সেহেরা ও আব্দুল মোনাফ ক্যাম্প-৬-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, বেগম জান ও নূর ফাতেমা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে নিজ নিজ শেডে ফিরে গেছে।
এর আগে গত সোমবার ভোর রাতে টানা বর্ষণের কারণে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত চার দিনের টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধস, দেয়ালচাপা ও পানিতে ডুবে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। এর মধ্যে শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই প্রাণ হারিয়েছে ১৬ জন।
বারবার প্রাণহানির পরও পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্তত দুই হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় মাইকিং করে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এরই মধ্যে দুই হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বললেন, উচ্চঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ধাপে ধাপে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কাজ চলছে। পাশাপাশি দুর্যোগ প্রস্তুতি, স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টিতে ভোগান্তি, আরও দুই শিশুর মৃত্যু: টানা চার দিনের বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের জনজীবন। মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে পানিতে তলিয়ে গেছে নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকা। বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গতকাল স্থগিত করা হয় চট্টগ্রাম জেলায় অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি পরীক্ষাও।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে হচ্ছে এই বৃষ্টিপাত। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সম্ভাবনা রয়েছে আরও ভারী বৃষ্টির।
আবহাওয়াবিদ মাহমুদুল আলম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি জারি করা হয়েছে পাহাড়ধসের সতর্কবার্তাও। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে নগরের চশমা বাজার, কাট্টলী, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদসহ হাঁটুপানি জমেছে বিভিন্ন এলাকায়। গত মঙ্গলবারও এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল। বৃষ্টি কিছুটা কমলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে গেলেও আবার বৃষ্টি শুরু হলেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল আলাদা পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে নগরের ষোলশহর মুক্তিযোদ্ধা পাহাড় ও সীতাকুণ্ড থানাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায়।
জঙ্গল সলিমপুরের খেজুরতলা সংলগ্ন বাগানবাড়ি এলাকায় সকালে পাহাড় ধসে মারা গেছে ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীর। এ ঘটনায় শিশুটির মা আহত হয়েছেন। তানভীর ওই এলাকার মহিন উদ্দীনের ছেলে। ষোলশহর মেয়রগলি মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়ের পাশে ভূমিধসে মারা গেছে সুমাইয়া আকতার (১১) নামে অন্য এক শিশু। দুপুর ১টার দিকে এই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট স্থানের প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা




