খামেনি অমর, অম্লান তার আদর্শ

লেখক সৈয়দ আবদুল হামিদ আহমাদি, সভাপতি, স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, ইরান
মৃত্যুর কয়েক মাস পরও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ঘিরে মানুষের আবেগ কমেনি। দেশজুড়ে তার স্মরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে নেমে আসে লাখো মানুষের ঢল। রাজধানী তেহরান থেকে কোম ও মাশহাদ সবখানেই ছিল শোক, শ্রদ্ধা আর জনসমুদ্রের এক বিরল দৃশ্য। অনেকের হাতে ছিল লাল পতাকা, যা প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গণসমাগম কেবল একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনেরই অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র, দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ও ঐক্যের একটি প্রতীকী বার্তা। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, খামেনি অমর। তার আদর্শের মতই অম্লান।
ইরানের দাবি, খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মাধ্যমে দেশটিকে দুর্বল করা, জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাদের মতে, সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। বরং যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের পর দেশের জনগণ আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হয়েছে।
খামেনির সমর্থকদের মতে, এই বিপুল জনসমাগম দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রথমত, এটি এমন একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা, যিনি দীর্ঘ ৩৭ বছর দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের দাবি, কঠিন আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও খামেনি আত্মসমর্পণ না করে দেশের স্বাধীনতা, অগ্রগতি ও আত্মনির্ভরশীলতার পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাদের বিশ্বাস, খামেনি শুধু ইরানের জনগণ নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের তরুণদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার নেতৃত্ব মানুষকে শিখিয়েছে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, জনগণের শক্তি এবং আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে যে কোনো পরাশক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব। ইরানের শক্তির ভিত্তি হাজার বছরের ইতিহাস, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ। এই ভিত্তি যুদ্ধ, বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
ইরানের জনসাধারণ আরও দাবি করে, সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটি আত্মসমর্পণ করেনি। বরং অতীতের ইরান-ইরাক যুদ্ধের মতো এবারও জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় বার্তাটি ইরানের শত্রুদের; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্দেশে— যাতে তারা ইরান, তার জনগণ, তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং তার শক্তি সম্পর্কে তাদের ভুল ও বিভ্রান্তিকর ধারণা সংশোধন করে। ইরানের শক্তির শিকড় হাজার বছরের সংস্কৃতি ও সভ্যতায়, তার জনগণের বিশ্বাসে এবং ইসলামি বিপ্লবের নীতি ও আদর্শে প্রোথিত— যে শিকড় সামরিক শক্তি, বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রতিক ১২ দিনের ও ৪০ দিনের যুদ্ধ ইরানি জনগণের প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে, তবুও তারা কখনোই ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। যেমন : সাদ্দাম হোসেন এবং তার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমর্থকদের চাপিয়ে দেওয়া আট বছরের যুদ্ধে ইরানের জনগণ সাহসিকতার সঙ্গে এবং সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের দেশ রক্ষা করেছিল, যার ফলে আগ্রাসী পক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।
পরিশেষে, শহীদ ইমাম খামেনি একজন ধর্মীয়, বিপ্লবী ও অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা হিসেবে ইসলামি বিপ্লবের সময় বিপ্লবী তরুণদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তেহরানের জুমার নামাজের খতিব হিসেবে ছিলেন একজন বিশিষ্ট ও অতুলনীয় বক্তা; চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদে ইমাম খোমেনির প্রতিনিধি হিসেবে ইরানের তরুণ যোদ্ধাদের সহযোদ্ধা ও সহচর ছিলেন; এবং ইরানের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ছিলেন একজন অসাধারণ ও মহান রাজনীতিবিদ। তার সাঁইত্রিশ বছরের নেতৃত্বে তিনি ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিপ্লবের জাহাজকে উত্তাল সাগরের মধ্য দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত করেছেন এবং ইরানের শত্রুদের অসংখ্য শত্রুতা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্কতা, নির্ভুলতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পথ দেখিয়ে ইরানকে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষাগত অগ্রগতির এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছেন, যেখানে আজ তা বিশ্বের একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে স্বীকৃত— একটি শক্তি, যার ভেতরে এখনো বহু অনুক্ত কথা লুকিয়ে রয়েছে।
বিদায়, প্রিয় খামেনি।
লেখক : সভাপতি, স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, ইরান




