গরিবের ‘ডাক্তারবাবু’ সুনীল মণ্ডল

চেম্বারে রোগী দেখছেন পল্লীচিকিৎসক সুনীল কুমার মণ্ডল । ছবি: আগামীর ছবি
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা পার্শ্বেখালী গ্রামের পল্লীচিকিৎসক সুনীল কুমার মণ্ডল। রোগীদের কাছে টাকা না থাকলেও দেন চিকিৎসা, জরুরি ওষুধও দেন বিনামূল্যে। এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিতি ‘গরিবের ডাক্তারবাবু’ নামে।
উপকূলঘেঁষা এই জনপদে আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনো অনেকের কাছে স্বপ্ন, স্থানীয় অনেকের কাছে সুনীল কুমার শুধু একজন গ্রাম্য ডাক্তার নন; বরং এলাকাবাসীর কাছে জীবন-সংকটে প্রথম ও শেষ ভরসা। উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের পার্শ্বেখালী এলাকার মইজুদ্দীনের মোড়ে ছোট্ট একটি ঘরে বসে রোগী দেখেন তিনি।
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, সুনীল কুমার রোগী দেখছেন, চারপাশে ভিড়। তাদের কেউ জেলে, কেউ কৃষক, কেউবা গৃহিণী। কক্ষ থেকে রোগীরা ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বের হচ্ছেন। কেউ ফি দিচ্ছেন ১০, কেউ ২০ বা সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। আবার কারও কারও কাছ থেকে কোনো ফি নিচ্ছেন না সুনীল; বরং ওষুধ দিয়ে দিচ্ছেন বিনামূল্যে।
রোগী দেখার ফাঁকে কথা হয় সুনীলের সঙ্গে। জানালেন, ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছা— কাকা ডা. গীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও বাবা পল্লীচিকিৎসক অশ্বিনী মণ্ডলের মতো চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবেন। পাশের ছোট ভেটখালীর গ্রাম্য চিকিৎসক সোলাইমান হোসেনের কাছে চিকিৎসায় হাতেখড়ি তার। এরপর পল্লীচিকিৎসার ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কোর্স সম্পন্ন করে নিজ গ্রামে চিকিৎসাসেবা শুরু করেন। এভাবেই ৪০ বছর ধরে নামমাত্র ফিতে রোগী দেখে যাচ্ছেন তিনি।
সুনীল কুমার (৬৬) জানালেন, সুন্দরবনের বাঘের আক্রমণে আহত রোগী থেকে শুরু করে জ্বর, সর্দি, কাশি, বাতব্যথা, আঘাত পাওয়া, শ্বাসকষ্ট, চুলকানিসহ ছোটখাটো প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা করেন তিনি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ৪০-৭০ জন রোগী দেখেন। রোগীরা যে টাকা দেন তাই নেন। কখনো রোগীদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেন না। কোনো রোগীর কাছে টাকা না থাকলে জরুরি কিছু ওষুধ বিনামূল্যেই দিয়ে দেন। আজীবন এভাবেই মানুষকে সেবা দিতে চান তিনি। স্মৃতিচারণ করেন সুনীল কুমার— সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে আহত ননীগোপাল নামের এক মৌয়াল তার জীবনের প্রথম রোগী। সেই রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন।
‘আমি টাকার জন্য চিকিৎসা দিই না। মানুষের দোয়া-আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য এ পেশায় এসেছি। জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা, আশীর্বাদ নিয়েই বিদায় নিতে চাই’— বলছিলেন সুনীল কুমার মণ্ডল।
সুনীলের চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা আছিয়া খাতুনের ভাষ্য, ‘এই ডাক্তারবাবু আমাগা প্রথম আর শেষ ভরসা। জঙ্গলে বাঘে ধরা হোক বা যেকোনো অসুখ-বিসুখ— আমরা উনার কাছেই আসি।’
‘ছোটবেলা থেইকা আমিসহ আমার পরিবারের সবাই ডাক্তারবাবুর কাছে চিকিৎসা নিই। আজও প্রেশার দেইখা ওষুধ দিল। টাকা দিইনি, উনিও চাননি’— বলছিলেন আরেক রোগী শাহাজান গাজী।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বললেন, ‘পল্লীচিকিৎসক সুনীল কুমার আমাদের এলাকার গর্ব। ৪০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসাকে তিনি কখনো ব্যবসা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের সেবাকেই নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। এমন মানুষ সমাজে খুবই বিরল।’




