মহারোমাঞ্চ শেষে মেসি এবং আর্জেন্টিনা

ছবি: রয়টার্স
অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর, নাটকীয়, অকল্পনীয়, রোমাঞ্চকর...! কোনো শব্দ দিয়ে আসলে বর্ণনা করতে পারবেন না। চোখে লেগে থাকা বলতে যা বোঝায়, তেমনি এক বিস্ময়কর ম্যাচ মঞ্চায়িত হলো আটলান্টা স্টেডিয়ামে। যেখানে থাকল আর্জেন্টিনার চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা ও দৃঢ় মানসিকতার অসাধারণ প্রদর্শনী আর ঘুরে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক নজির। অন্যদিকে চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের অসম্ভব সামর্থ্যের সাক্ষী হয়ে রইল মিসর।
আর লিওনেল মেসি? আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি সময় ছাপিয়ে সর্বকালের সেরা। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই নাটকীয় জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা। মিসরের অলআউট ফুটবলে দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে হারের আশঙ্কা যখন চেপে ধরেছিল তীব্রভাবে, ঠিক তখনই ১৩ মিনিটের ঝড়ে আর্জেন্টিনা লিখল মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন। শেষ মুহূর্তের ঝড়ে ৩-২ গোলের জয়ে মিসরকে কাঁদিয়ে মেসিরা পৌঁছে গেছে শেষ আটে।
২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালই যেন ফিরে এলো আটলান্টা স্টেডিয়ামের ৯০ মিনিটে। পার্থক্য বলতে সেবার আর্জেন্টিনা এগিয়ে ছিল ২-০ গোলে, এবার পিছিয়ে পড়েছিল একই ব্যবধানে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন লড়াই জেতার পর মেসি জানিয়েছিলেন, এই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি মানসিকতা। সেটাই ফুটে উঠল মিসর ম্যাচে।
১৫তম মিনিটে ইয়াসির ইব্রাহিমের চমৎকার হেডে আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ার পর মেসির পেনাল্টি মিস। মানসিকভাবে তখন ভেঙে পড়ারই কথা। তা ছাড়া মিসর গোলকিপার মোস্তফা শুবিবের অতিমানবীয় সেভগুলো আরও হতাশায় ডোবাচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে। হুলিয়ান আলভারেসের সুযোগটাই ধরা যাক। ৩৯ মিনিটে নিশ্চিত গোল হতে দেননি মিসর স্টপার। পোস্টও যেন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আলবিসেলেস্তেদের। মেসির ফ্রি-কিক প্রতিহত হয় বাইরের পোস্টে।
দুর্ভাগ্য ও শুবিরের অসামান্য দক্ষতায় এক গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে আর্জেন্টিনা। বিরতি থেকে ফিরে এসে চলতে থাকে গোলের খোঁজ। তবে অতি-আক্রমণাত্মক মানসিকতায় বারকয়েক ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের রক্ষণ। তেমনই এক পরিস্থিতিতে ৫৮ মিনিটে আবারও গোল উৎসবে মাতে আফ্রিকান দেশটি। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের, ভিএআরে রক্ষা আর্জেন্টিনার। মোস্তফা জিকোর গোলের বিল্ডআপে ফাউলের শিকার হয়েছিলেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। ফল, বাতিল মিসরের গোলটি।
মিসর থেমে যায়নি। প্রেসিং ফুটবলে আর্জেন্টিনার ওপর চাপ তৈরি করতে থাকে। একই সঙ্গে থাকে প্রতিআক্রমণের সুযোগের অপেক্ষায়। বেশিক্ষণ অপেক্ষায় থাকতেও হয়নি। কিছুক্ষণ আগেই গোল বাতিলে হতাশা-ক্ষোভে ফেটে পড়া সেই জিকো এবার সফল। সেই প্রতিআক্রমণ থেকেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এই ফরোয়ার্ড। মোহাম্মদ সালাহর টেনে নেওয়া বল টোকায় পেয়ে যান হাইসেম হাসান। তার ক্রস থেকে জিকোর চমৎকার গোল।
ম্যাচ ঘড়িতে তখন ৬৭ মিনিট। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনার বিদায়ের শঙ্কা জালে প্রবলভাবে। কিন্তু মেসির ওই কথাটা— ‘শেষ পর্যন্ত লড়াই করে আর্জেন্টিনা।’ সেটাই ফুটে ওঠল ম্যাচের বাকি সময়ে। যে মেসি পেনাল্টি মিস করছিলেন, বারবার বল হারাচ্ছিলেন, মিসরের মার্কিং কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না— সেই তিনিই শেষের ১৫ মিনিটে দেখা দিলেন চিরচেনা ছন্দে। পজিশন পাল্টে ফিরে গেলেন পরিচিত রাইট উইংয়ে, আর্জেন্টিনার খেলাও পাল্টে গেল। বলের জোগান বাড়তে থাকল মিসরের বক্সে। ফলও পেলেন ৭৯ মিনিটে। ডানপ্রান্ত থেকে তার মাপা ক্রস লাফিয়ে হেড করে জাল খুঁজে নেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয় আর্জেন্টিনা। আরেকটি গোল পেলেই খেলা যাবে অতিরিক্ত সময়ে। এজন্য কারও ওপর অপেক্ষা করলেন না মেসি। মিনিট চারেক পর নিজেই করলেন এবারের বিশ্বকাপের অষ্টম গোল। তার বাঁ পায়ের জোরালো শট মিসর গোলকিপারের হাতে লেগে ক্রসবারের নিচে আঘাত করে ঢুকে যায় জালে।
২-২ গোলে সমতায় আর্জেন্টিনা! কোয়ার্টার ফাইনালের আশা বেঁচে থাকল তাতে। খেলা তখন অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার অপেক্ষা। কিন্তু বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের এত অপেক্ষার সময় কই! ঘুরে দাঁড়ানোর দুর্দান্ত গল্প লিখে মানসিক দৃঢ়তার পারদ আকাশে চড়া এই দলটি ইনজুরি টাইমেই টেনে দিল ম্যাচের যবনিকা। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসের ঠান্ডা মাথার ক্রস থেকে ফাঁকায় দাঁড়ানো এনসো ফের্নান্দেসের হেড। ব্যস, ৩-২ গোলের অবিশ্বাস্য জয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে।
শেষ বাঁশি বাজতেই মেসির চোখে জল। আনন্দের প্রকাশ বেরিয়ে এলো চোখের বৃষ্টিধারায়। পূর্ণতার আনন্দ তার এখানেই থামেনি। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিস্ময় ছড়িয়ে যাচ্ছেন ম্যাচের পর ম্যাচ। তাইতো সতীর্থদের আনন্দের মধ্যমণি তিনি, শূন্যে ভাসিয়ে দে পল-পারেদেসরা দিলেন বিশেষ সম্মাননা। মেসির উড়তে থাকা ছবিটা হয়তো বিশ্বকে জানান দিল— মেসি উড়লে আর্জেন্টিনা উড়বেই!






