সারা দেশে বৃষ্টি ডুবল চট্টগ্রাম

সংগৃহীত ছবি
আষাঢ়ের শেষ দিকে এসে আবারও সক্রিয় হয়েছে মৌসুমি বৃষ্টিপাত। টানা বর্ষণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে দেখা দিয়েছে অস্থায়ী বন্যা পরিস্থিতি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে ভয়াবহ। বন্দর নগরীতে গত সোমবার বেলা ৩টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরেছে, যা ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই অতিভারী বর্ষণে সোম ও মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। সড়ক ও রেলপথ ডুবে বিঘ্ন ঘটেছে যোগাযোগে। তুমুল বর্ষণের কারণে বিলম্বিত হয়েছে শাহ আমানত বিমানবন্দরের কয়েকটি ফ্লাইট।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বললেন, এটি সুস্পষ্ট লঘুচাপ। বর্তমানে লঘুচাপটি মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে অবস্থান করছে। এটি আরও ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। তবে এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বেশি রয়েছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সে কারণেই সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, ১১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর কিছুটা কমে আসতে পারে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা। এ ছাড়া এ সময়ের মধ্যে দেশের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় ৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। থেমে থেমে চলা এ বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেক যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানজটও সৃষ্টি হয়।
এদিকে চট্টগ্রামে টানা ভারী বর্ষণের কারণে কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও এর কাছাকাছি এলাকায় মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ প্রভাব আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চল এবং রাজধানী ঢাকাতেও বৃষ্টি হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে এসব জেলার নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার কিছু এলাকায় সতর্কসীমা
স্পর্শ করতে পারে।
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি আপাতত বিপৎসীমার নিচে থাকলেও সুরমা-কুশিয়ারা, তিস্তা, ফেনী, মুহুরী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, গোমতী, হালদাসহ বেশ কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বন্যা ও পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার, অপ্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টি, নগর ভাসছে জলে: মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রাম নগরীতে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরার তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। প্রবল এ বর্ষণের মধ্যে জোয়ারের কারণে নগরীর আরও কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে। পানি উঠেছে অন্তত তিনটি সড়কে। রেলপথ ডুবে আটকা পড়ে পর্যটক এক্সপ্রেসও।
নগরীর পোর্ট কানেকটিং সড়কের হালিশহর আবাসিক থেকে নয়াবাজার পর্যন্ত অংশ, অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের বড় দীঘিরপাড় অংশ এবং আরাকান সড়কের সিঅ্যান্ডবি ও মৌলভী পুকুরপাড় এলাকার সড়ক তলিয়ে গেছে।
এ ছাড়া কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, সিডিএ আবাসিক এলাকা, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলা, চকবাজার, রামপুর, তিন পোলের মাথা, বাটালি রোড, কাস্টম হাউজ, জামালখান বাই লেন, রহমতগঞ্জ, হালিশহর আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ বেপারীপাড়া কাঁচাবাজার, মৌলভীপাড়া এলাকা ও কাঠগড় মুসলিমাবাদ এলাকায় জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে স্থগিত করা হয়েছে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাও।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্তব্যরত আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও আছে।
বান্দরবানে আটকা দেড় শতাধিক পর্যটক: চার দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন এলাকা। জলপথ ও পাহাড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ। এদিকে সাঙ্গু নদী উত্তাল থাকায় থানচির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে আটকা পড়েছেন দেড় শতাধিক পর্যটক।
সঙ্গে ১৮ জন ট্যুর গাইড।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল ফয়সাল জানিয়েছেন, পর্যটক ও গাইডদের সবাই নিরাপদে আছেন। নদীর স্রোত স্বাভাবিক হলে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে।




