অবস্থা শোচনীয় সারা দেশে

সংগৃহীত ছবি
আসমান যেন বিশ্রাম নিতে ভুলে গেছে। অঝোরে ঝরাচ্ছে বারি। থেমে থেমে দেড় সপ্তাহ ধরে চলছে এই বর্ষণ। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টিতে দেশের অনেক এলাকায় ভেঙেছে মৌসুমের রেকর্ড। খোদ রাজধানীতেই অনেক গলি, সড়ক ও মহাসড়কে জমে হাঁটুপানি। কোথাও কোথাও পেরিয়ে যায় কোমর। ঢাকা বিভাগের তুলনায় বন্যাপ্রবণ চট্টগ্রাম ও সিলেটের অবস্থা কিছুটা ভালো। দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে বাদল নামলেও চট্টগ্রামে কমছে পানি, উন্নতি হচ্ছে বানের। আর সিলেটের কিছু এলাকায় পানি নামতে শুরু করলেও বাড়ছে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায়। এ ছাড়া সারা দেশে বন্যা ও পাহাড়-ভূমিধসে প্রাণহানি ঘটেছে আরও তিনজনের। তবে ভোগান্তি কমতে আরও কিছু অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
‘আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নদ-নদীর পানি বেড়ে কোথাও কোথাও অতিক্রম করতে পারে বিপৎসীমা। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে দেখা দিতে পারে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি’— আশঙ্কা পূর্বাভাস কেন্দ্রের।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত সপ্তাহে কয়েক দিন টানা দুই শতাধিক মিলিমিটার হারে বৃষ্টিপাতে ডুবে যায় নগরী। বন্যায় পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ। তবে গতকাল চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় বর্ষণ হয়েছে ১০৫ মিলিমিটার, কক্সবাজারে আরেকটু বেশি, ১১৫ মিমি। আর সিলেটের জৈন্তাপুরে সর্বোচ্চ বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ১০৯ মিমি, যেখানে জুলাইয়ে সাধারণ বৃষ্টিপাত প্রায় সাড়ে ৫০০ মিমি। তবে আকাশ ভেঙে পড়ে ঢাকা বিভাগে! রাজধানীতে ১৩৫, কিশোরগঞ্জে ১৩০, মুন্সীগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ১৭২ মিমি বর্ষণ হয়েছে।
আরও তিন প্রাণহানি: বন্যা, ভূমিধস ও স্রোতের তোড়ে গতকাল আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ১২ বছরের শিশু সজিব জলদাশ; জেলার পেকুয়ার বলিরপাড়া গ্রামে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে দেড় বছরের শিশু মুশফিকের এবং সদর উপজেলার ঝিলংজার ঝিরঝিরিপাড়ায় পাহাড়ধসে নিহত রোজিনা আক্তার।
রাজধানীর অতিবৃষ্টিতে হাঁটু ও কোমরপানিতে তলিয়ে যায় নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ অলিগলি ও সড়ক-মহাসড়ক। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় বনানী, নিউ মার্কেট, শান্তিনগর, পল্টন, মহাখালী, বৃহত্তর মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর হাউজিং এলাকায়। শুধু তা-ই নয়, বন্ধ হয়ে যায় নিউ মার্কেটসহ কয়েকটি এলাকার দোকানপাট। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীর পানি ও স্রোত বাড়ায় ভাঙনের আতঙ্কে তীরবর্তী শত শত পরিবার।
রাঙামাটিতে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যার পর এখনো ফেরেনি স্বাভাবিক জীবন। তবে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। পানি যতই কমছে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র, বাড়ছে ভোগান্তি। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাঘাইছড়িতে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও গবাদি পশুর খাদ্যের সংকটে দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। একই সঙ্গে ফসলি জমি ও মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতিতে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা।
তবে কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতি উল্টোদিকে মোড় নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টি কিছুটা কম থাকায় কমতে শুরু করেছিল পানি; কিন্তু দুপুর গড়াতেই আবার আকাশ কালো করে নামে মুষলধারে বৃষ্টি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শঙ্কায় পরিণত হয় সেই আশা। পানি কমার বদলে আবার বাড়ছে নিম্নাঞ্চলে। নতুন করে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা। মৃত্যু হয়েছে আরও তিনজনের।
সিলেট বিভাগের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে শুধু মৌলভীবাজারে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কমতে শুরু করেছে পানি, জাগছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। তলিয়ে গেছে আমন ও আউশের বীজতলা, নষ্ট হয়েছে কৃষিজমি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক। ডুবে গেছে নলকূপ ও পুকুর। অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটে দুর্ভোগে রয়েছেন বন্যাকবলিত মানুষ।
হবিগঞ্জের পরিস্থিতির খুব একটা অবনতি হয়নি, তবে উন্নতিও নেই। বিশেষ করে বানিয়াচংয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। টানা বৃষ্টি ও খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যায় নষ্ট হয়েছে ৪০ হেক্টর জমির আউশ ধান এবং সাড়ে ৩ হেক্টর জমির শাকসবজি। এতে কয়েক দিন আগেও ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখা কৃষকের আশা এখন পানির নিচে।
বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ৫১: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকালের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, দেশের সাত জেলায় চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ মানুষ। এখনো পানিবন্দি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের সদস্যরা। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য গত ছয় দিনে সরকার নগদ বরাদ্দ দিয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ টন চাল। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিপ্রতি নগদ বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ২৮ টাকা এবং চাল প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ ব্যক্তি। ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী অথবা অতিভারী তথা ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যেও সামান্য বাড়তে পারে দিনের তাপমাত্রা।
বন্যাকবলিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন: ত্রাণ সহায়তা জোরদার ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে ১১ জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করেছে সরকার। জেলাগুলো হলো— কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুর। গতকাল বিজিবি সদর দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিরা




