ভ্যানে বসে পানিতে ভেসে শেষে অফিসে

পানিতে থই থই করছে রাজধানীর পাকা সড়ক/প্রতীকী ছবি
মাসুম বাশার সকালে ঘুম থেকে উঠেই যেন আকাশের তারা হাতে পেয়েছিলেন। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের অতিগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জিতেছে! ম্যাচের সব টেনশন শেষে এমন এক স্বস্তি, যেন দীর্ঘ অমাবস্যার পর উঠেছে সূর্য। ফুরফুরে মেজাজে বের হলেন, গায়ে সদ্য ইস্ত্রি করা শার্ট, পায়ে চকচকে জুতা। অফিস যাবেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে উচ্চমার্গের বিশ্লেষণ হবে, মেসির গ্রেটনেস নিয়ে কারও সঙ্গে বিতর্কে নামবেন— এমন এক অপেক্ষিত সকাল।
বাসা থেকে বের হয়েই অবশ্য তার সেই ফুরফুরে ভাব খানিকটা ধাক্কা খেল। সারা রাত বৃষ্টি ঝরেছে থেমে থেমে। তবে থেমে থেমে যে হয়েছে, রাস্তা দেখে তা বোঝার উপায় নেই। কোনো শিল্পোদ্যোক্তা যেন আকাশের সব পানি ঢালাও ডিসকাউন্টে ছেড়ে দিয়েছেন। কলাবাগানের লাল ফকিরের মাজার এলাকার রাস্তাটা হয়ে আছে কাতলাহার বিল। পানি থইথই করছে, সেই পানিতে রাস্তার পাশের ডাস্টবিন থেকে ভেসে আসা নানা অনুষঙ্গ যেন এক ভাসমান বাস্তুতন্ত্রের সৃষ্টি করেছে। মাসুম বাশার প্যান্ট গুটিয়ে, জুতা হাতে, সাহসে বুক বেঁধে নামলেন পানিতে। ভাবলেন, বিশ-পঁচিশ গজ পানি, পেরোলেই তো শুকনো রাস্তা।
কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। মাঝপথে এক বেকায়দা কদমে পিছলে গেলেন এক্কেবারে। ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেল কাদা-পানিতে, ভারসাম্যহীন হয়ে বাঁ পাও গেল এক গর্তে। প্যান্ট ভিজল, তার সঙ্গে মানসম্ভ্রমও সমসাময়িকভাবে ডুব দিল সেই থইথই পানিতে। ঠিক এমন সময় তার সামনেই একটি রিকশা গেল উল্টে, আরেকটি রিকশার যাত্রী আর্তনাদ করে উঠলেন। মাসুম বাশার কোনোমতে টলতে টলতে পার হলেন, শরীর তখন ভেজা আর মনে জ্বালা। বাসায় ফিরতেই স্ত্রীর সেই অবধারিত বচন— ‘এই সামান্য পানি দেখেই একদম গরুর মতন নেমে গেলে? একটু দেখে-শুনে চলতে পারো না?’ মাসুম বাশার স্তব্ধ নির্বিকার। ভেজা কাপড় বদলে আবার প্রস্তুত হলেন অফিস অভিযানে। এবার স্ট্র্যাটেজি বদলেছেন— হাঁটবেন না, রিকশা নেবেন।
লাল ফকিরের মাজার থেকে রিকশা পেতে খুব একটা কষ্ট হলো না। বরং রিকশাওয়ালারা ফুলেফেঁপে উঠেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, ফলে ভাড়া যেন নিলামে উঠেছে। ‘স্যার, এই পানি পাড়ি দিতে গেলে দুই লিটার চা খাইতে হয়, হাঁটুতে বাত ধরে, ১০ টাকা বাড়তি না দিলে চলে না।’ বক্তব্যের যুক্তি অস্বীকার করা কঠিন। ৪০ গজ পানি পাড়ি দিতে মাসুম বাশারের পকেট থেকে বেরোল পঞ্চাশ টাকার নোট। তিনি কিছু বলতে গেলেন কিন্তু রিকশাওয়ালা আগেই বললেন, ‘স্যার, খুচরা নাই।’ মাসুম বাশার বুঝলেন, পানি আর রিকশাওয়ালা— উভয়েরই আছে পকেট কাটার ট্রেনিং।
রিকশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন তিনি গ্রিন রোডের মোড়ে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, রাস্তা নেই, যেন একটি দীর্ঘ খাল। মনে হয় ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সফলতার উদাহরণ। পানি হাঁটুর ওপরে, কাদামাখা, রঙ চায়ের মতন। রিকশাওয়ালা বললেন, ‘স্যার, এই পানি পার হইতে আরও কুড়ি টাকা। নইলে আমি ঘুরাইয়া স্কয়ারের সামনে দিয়া যাই।’ মাসুম বাশারের তখন তাড়া, অফিসে দেরি হলে বসের চোখরাঙানি আছে। রাজি হওয়া ছাড়া আর উপায় কী!
স্কয়ার হাসপাতালের সামনে এসে মনে হলো, হাসপাতালের এমন অবস্থা দেখে অসুস্থ লোকেরা সুস্থ হতে চাইলেও আটকা পড়বে এ পানিতেই। পান্থপথ সোজা পেরিয়ে তেজতুরী বাজার এলাকায় পৌঁছে আবার সেই চেনা দুর্ভোগের দৃশ্য— রাস্তায় হাঁটুজল, কোথাও কোথাও কোমরজল, যেন এক স্থায়ী জলাধার। রিকশা আর যাবে না। রিকশাওয়ালা কয়েকটা টাকা বাড়তি আদায় করে বিদায় নিলেন। মাসুম বাশার আবার পড়লেন বিপদে। সামনে কর্দমাক্ত জল, তাতে মাঝেমধ্যে বিশেষভাবে চেনাজানা বস্তু ভেসে আছে।
ঠিক তখনই এক ভ্যানচালক, বয়স ষাটের কাছাকাছি, গোঁফে পান-জর্দার ছোপ, এগিয়ে এলেন। ‘স্যার, ভ্যানে ওঠেন, মাত্র ৪০ টাকা, ওই পার পর্যন্ত।’ মাসুম বাশার বুঝলেন, এটি ভ্যান নয়, এটি নোয়া’স আর্ক। বন্যাপীড়িত এ শহরে কে কখন কীসে ভাসে, কে জানে! ৪০ টাকা মাথাপিছু দিয়ে ১২ জনে এক ভ্যানে উঠে পা বুকের সঙ্গে প্রায় ভাঁজ করে পার হলেন সেই পানিটুকু, কিন্তু নামতেই বাস্তবতার অব্যর্থ তীর যেন তৈরিই ছিল। তেজতুরী বাজারের ডেইলি স্টারের গলি। পায়ের নিচে কী যেন পিচ্ছিল, যেন পানির নিচে এক আস্ত ‘অচেনা ভূগোল’ লুকিয়ে আছে। মাসুম বাশার দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন। হাঁটবেন? নাকি উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন? পানি থেকে দুর্গন্ধ, জ্বালা করছে চোখ, জীবনের প্রতি বিরক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে।
ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন; ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তার কাছে এক অদ্ভুত যন্ত্র— একটি ভাঙা শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ভ্যান। বললেন, ‘স্যার, ২০ টাকা দেন, টেনে পার করে দেই কিন্তু পা তুলে বসতে হবে।’
উপায় নেই। মাসুম বাশার পা তুলে, নাকে রুমাল চেপে, ওই পার্থিব দুর্গন্ধময় জলরাশি পাড়ি দিলেন ৪০ টাকায়।
কারওয়ান বাজারে পৌঁছে মাসুম বাশারের অবস্থা কাতর। জুতা কাদামাখা, প্যান্টের অর্ধেক ভেজা, শরীরে অদ্ভুত সব গন্ধের সম্মিলন। অফিস করার ইচ্ছা একেবারে উধাও। ভাবলেন, বাড়িই ফিরে যাবেন। ঠিক তখনই এক সহকর্মী, তৌফিকুর রহমান, এগিয়ে এলেন। তৌফিকের হাতে অফিসের ব্র্যান্ডিংয়ের একটি গেঞ্জি। বললেন, ‘মাসুম ভাই, এইটা পরেন। টয়লেটে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হোন। প্যান্ট-শার্ট শুকায় ফেলেন। আর চলেন এক কাপ চা খাই। আর্জেন্টিনা জিতছে, এই পানির দুঃখ ভুইলা যান।’
কী আর করা? চলুন আমরা সব দুঃখ ভুলে আবার ডোবার প্রস্তুতি নিই!




