এক অকুতোভয় স্বপ্নদ্রষ্টার রোমাঞ্চকর উপাখ্যান

যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলাম বাবুল
ঢাকার নবাবগঞ্জের সাধারণ একটি গ্রাম কামালখোলা। সেই গ্রামে বেড়ে ওঠা এক তরুণের চোখে ছিল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যিনি রাইফেল হাতে লড়েছিলেন অকুতোভয় গেরিলা হিসেবে, দেশ স্বাধীনের পর তিনিই নেমে পড়লেন ভিন্ন এক যুদ্ধে। তার এবারের যুদ্ধ দেশকে স্বাবলম্বী করার।
১৯৭৪ সালে প্রায় শূন্য হাতে শুরু করলেন কাজ। নিজের মেধা, কারিগরি জ্ঞান আর পরিশ্রমের ওপর ভর করে তিনি একে একে গড়ে তুললেন ৪২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কামালখোলা গ্রামের সেই স্বপ্নবান তরুণের হাত ধরে তৈরি হলো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শপিং মল। দেশের ইলেকট্রনিকস ও টেক্সটাইল খাতে এলো দেশীয় উৎপাদনের জোয়ার। যার হাত ধরে লেখা হলো এই রোমাঞ্চকর উপাখ্যান, তিনি হলেন যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মো. নুরুল ইসলাম বাবুল। আজ তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৪৬ সালের ৩ মে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার চুরাইন ইউনিয়নের কামালখোলা গ্রামে জন্ম নেন নুরুল ইসলাম। বাবা আমজাদ হোসেন এবং মা জোমিলা খাতুন। শৈশব কেটেছে ইছামতী নদীর তীরে। পরে ঢাকায় এসে স্থাপত্যবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নেন। নকশা তৈরি থেকে বাস্তবে বড় স্থাপনা নির্মাণের এই শিক্ষা পরে তার শিল্পায়নের চিন্তা ও পরিকল্পনার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের
সময় তিনি ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য। অংশ নেন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সব অভিযানে। যুদ্ধজয়ের
পর বিধ্বস্ত দেশের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার
পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে।
সে উপলব্ধিই তাকে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে দেয়, ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে যমুনা গ্রুপ। সদ্য স্বাধীন দেশের বাজার তখন আমদানিনির্ভর এবং শিল্পকারখানার অবস্থা ছিল নাজুক। এমন এক অনিশ্চিত সময়ে নুরুল ইসলাম বাবুল ব্যবসার সহজ পথ খোঁজেননি। বিদেশ থেকে পণ্য এনে শুধু কেনাবেচা বা ট্রেডিং করলে দ্রুত মুনাফা পাওয়া যেত; কিন্তু তাতে দেশের মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হতো না। বরং তিনি বেছে নিলেন উৎপাদনের মতো এক অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি পথ। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড। বিদেশি বৈদ্যুতিক পণ্যের বিকল্প হিসেবে দেশেই আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে যমুনা ব্র্যান্ডের ভিত্তি গড়ে উঠল। স্থানীয় কাঁচামাল ও জনশক্তির ব্যবহারে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই অর্জন করল মানুষের আস্থা।
প্রথম সাফল্যের
পর নুরুল ইসলাম উপলব্ধি করেন, টেকসই শিল্পায়নের জন্য বহুমুখী বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই
আশির দশকে আবাসন, প্রকৌশল ও কেবলস শিল্পে বিনিয়োগ করেন। নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলাদেশের
তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে নিজের নাম লেখাতে শুরু করে, তখন তিনি এ খাতে বড় বিনিয়োগের
সিদ্ধান্ত নেন। তবে তিনি কেবল তৈরি পোশাক বা শার্ট-প্যান্ট সেলাই করে রপ্তানির মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। তিনি জানতেন, কাপড়ের জন্য যদি অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়,
তবে এ খাতের ভিত্তি কখনো মজবুত হবে না। তাই তিনি জোর দিলেন এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা
সুতা ও কাপড় উৎপাদনের ওপর।
এ ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় শামীম স্পিনিং মিলস লিমিটেড, শামীম কম্পোজিট মিলস লিমিটেড
এবং যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড। সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এসব কারখানা আন্তর্জাতিক মানের সুতা ও কাপড় উৎপাদন
শুরু করে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে
কমাতে সক্ষম হয়। রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় রপ্তানি
ট্রফির স্বর্ণ ও রৌপ্যপদক অর্জন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যমুনার শিল্প ব্যবস্থাপনা
পায় নানা স্বীকৃতি।
নুরুল ইসলাম বাবুলের উদ্যোক্তা জীবনের একটি বড় দিক ছিল বহুমুখীকরণ নীতি এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সাহস। তার সবচেয়ে সাহসী উদ্যোগগুলোর একটি ছিল যমুনা ফিউচার পার্ক নির্মাণ। যখন অনেকেই এ প্রকল্পকে অবাস্তব বলে মনে করেছিলেন, তখন তিনি নিজের স্থাপত্যজ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টা ও বিশাল বিনিয়োগের পর গড়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শপিং মল ও বিনোদনকেন্দ্র। এটি শুধু একটি বিপণিবিতান নয়; বরং আধুনিক নগর পরিকল্পনা, বাণিজ্য, পর্যটন এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে যমুনা বিল্ডার্সের মাধ্যমে আবাসন খাতেও তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
শিল্পায়নের সমান্তরালে নুরুল ইসলাম বাবুল সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা এবং মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। এই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই ১৯৯৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় দৈনিক ‘যুগান্তর’। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থের পক্ষে কথা বলার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করে পত্রিকাটি। পরে তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং দৃশ্যমাধ্যমের বিপুল জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘যমুনা টেলিভিশন’। আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল নিয়ে শুরু হওয়া এই টেলিভিশন চ্যানেলটিও দ্রুত দেশের অন্যতম শীর্ষ সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে পরিণত হয়। ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব পাশে সরিয়ে রেখে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সাহসী গণমাধ্যম কাঠামো দাঁড়ানো ছিল তার কর্মময় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনসচেতনতা বাড়াতে অবদান রেখে চলেছে।
যমুনা গ্রুপের আরেকটি বড় পদক্ষেপ ছিল ‘যমুনা ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড অটোমোবাইলস’ প্রতিষ্ঠা। একসময় বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন কিংবা মোটরসাইকেল ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর বিলাসী পণ্য। নুরুল ইসলাম বাবুল এ ধারণাকে বদলে দেন। তিনি দেশেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তির হাইটেক ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপন করেন। ফলে সাশ্রয়ী মূল্যে এবং বিশ্বমানের গুণগত মান নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এসব ইলেকট্রনিকস সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। এই একটি খাতের মাধ্যমেই দেশের কোটি কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হয় এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডটি দেশের মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর বাইরেও কেমিক্যাল, লেদার, বেভারেজ, কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজসহ প্রায় ৪২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তিনি জীবদ্দশায় গড়ে তুলেছিলেন, যার প্রতিটিই দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখছে।
তার শিল্পদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন। তিনি শ্রমিকদের দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, দেশের টাকা দেশের মাটিতেই বিনিয়োগ করা উচিত। প্রতিকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি কখনো বিদেশের মাটিতে অর্থ পাচার বা অফশোর ব্যবসা গড়ে তোলার কথা ভাবেননি। তার সব পুঁজি ও মেধা তিনি বিনিয়োগ করেছেন এদেশের মাটিতে, এদেশের মানুষের জন্য। বর্তমানে যমুনা গ্রুপে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে; পরোক্ষভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সংস্কৃতিতে অনেক বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তার বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ খেলাপের অভিযোগ উঠলেও, তিনি ছিলেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তার কিংবা যমুনা গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খেলাপি ঋণের অভিযোগ নেই। ব্যাংক খাতের নিয়ম ও শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মেনে চলে সময়মতো ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে তিনি স্থাপন করেছেন দৃষ্টান্ত। দেশের অন্যতম বৃহৎ করদাতা শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে যমুনা গ্রুপ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভ্যাট, শুল্ক ও কর দিয়ে চলেছে। দেশীয় মালিকানায় গড়ে ওঠা এ শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক অনন্য উদাহরণ, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল একজন মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেম, সততা ও দূরদর্শিতার ওপর।
২০২০ সালের ১৩ জুলাই নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর যমুনা গ্রুপের ভার নেন তার সহধর্মিণী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম ইসলামের নেতৃত্বে এবং পরিচালক সুমাইয়া রোজালিন ইসলাম, মনিকা নাজনীন ইসলাম ও শারিয়াত তাসরিন সোনিয়া ইসলামের সক্রিয় অংশগ্রহণে গ্রুপটি আজও তার আদর্শ ও কর্মদর্শন অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে। নতুন প্রজন্মের এই নেতৃত্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে কাজ করছে।
মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পোদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম তার কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ থেকে আধুনিক শিল্পোন্নত অর্থনীতির পথে যাত্রায় তার অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে এই কর্মবীরের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।




