আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করল মিয়ানমার

মিয়ানমারের ইউনিয়ন পার্লামেন্ট- সংগৃহীত
মিয়ানমারের জন্য প্রস্তাব করা আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির জান্তা নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এই প্রস্তাব।
সেনা সমর্থিত আইনপ্রণেতাদের চাপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাদের দাবি, এই পরিকল্পনা মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আসিয়ানের এই ‘পাঁচ দফা ঐকমত্য’ প্রত্যাখ্যানের প্রস্তাবটি গত ২৬ জুন পার্লামেন্টে উত্থাপন করেন জান্তার প্রক্সি দল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির’ (ইউএসডিপি) নেতা নন্দ হ্লা মিন্ট। এরপর এই প্রত্যাখ্যান প্রস্তাবের পক্ষে বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা পার্লামেন্টে বক্তব্য দেন। আলোচনা শেষে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ইউনিয়ন পার্লামেন্টের স্পিকার অং লিন ড্বে প্রস্তাবটি অনুমোদন করেন।
২০২১ সালের এপ্রিলে দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংকট সমাধানে এই পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল আসিয়ান। কিন্তু শুরু থেকেই জান্তা সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রত্যাখ্যান, ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো এবং আঞ্চলিক বৈধতা ধরে রেখে চুক্তিটিকে নড়বড়ে করার কূটনৈতিক কৌশল। মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন জান্তা এই ঐকমত্যের একটি শর্তও (যেমন সহিংসতা বন্ধ করা) কখনো বাস্তবায়ন করেনি। উল্টো তারা এই পাঁচ দফাকে মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের ওপর একটি অবৈধ চাপ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে আসছিল।
জান্তার দাবি, এটি আসিয়ানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ মূল নীতির পরিপন্থী এবং জোটের মধ্যে মিয়ানমারের সমঅধিকার ক্ষুণ্ন করে। এর ফলে ২০২১ সাল থেকেই জান্তা নেতৃত্বকে আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনে নিষিদ্ধ রাখা হচ্ছে।
গত মে মাসে ফিলিপাইনের সেবুতে অনুষ্ঠিত আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলন থেকে দ্বিতীয়বার বাদ পড়েন মিন অং হ্লাইং। এরপর থেকে এই শান্তি পরিকল্পনার বিরোধিতা আরও বেড়ে যায়। উল্লেখ্য, এই নিষেধাজ্ঞার মাত্র এক মাস আগে মিন অং হ্লাইং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে সামরিক শাসক থেকে তথাকথিত ‘বেসামরিক প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আসিয়ানের যুক্তি, গত পাঁচ বছরে জান্তা এই ঐকমত্য বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখায়নি। শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে তারা সামরিক অভিযান ও যুদ্ধাপরাধ অব্যাহত রেখেছে। এর জেরেই সেনা সমর্থিত আইনপ্রণেতারা দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি পার্লামেন্টে তোলেন।
আইনপ্রণেতাদের যুক্তি, এটি কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, বরং আসিয়ান চেয়ারপারসনের বিবৃতির একটি সাধারণ পরিশিষ্ট মাত্র। প্রায় ৩০ জন আইনপ্রণেতা এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। তাদের দাবি, ২০২১ সাল থেকে শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে মিন অং হ্লাইংয়ের অনুপস্থিতি মিয়ানমারের জাতীয় মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, যেহেতু জান্তা যেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাই এখন এই শান্তি পরিকল্পনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত।
ঠিক এক মাস আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মিন অং হ্লাইংকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আসিয়ান এবং জাতিসংঘে মিয়ানমারের পূর্ণ, সমান এবং গঠনমূলক অংশগ্রহণে সমর্থন করবে বেইজিং। এর মধ্যেই দেশটির পার্লামেন্ট এমন সিদ্ধান্ত নিল।
মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এখনো এই পাঁচ দফাকে মূল কাঠামো হিসেবে রেখেছে আসিয়ান। তবে সম্পর্ক কীভাবে এগোনো যায় তা নিয়ে জোটের মধ্যেই বিভেদ রয়েছে। থাইল্যান্ড জানিয়েছে, তারা মিয়ানমারকে পুনরায় জোটে ফেরাতে সহায়তা করতে চায়। লাওস সম্প্রতি মিন অং হ্লাইংকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া জান্তার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমার সংকটের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে।
মিয়ানমার-আসিয়ান সম্পর্ক বিশ্লেষক উ উইন মিন সতর্ক করে বলেছেন, পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচ দফার বিরোধিতার সিদ্ধান্ত আসিয়ানে নেপিদোর ফেরার পথ আরও কঠিন করে তুলবে। পদক্ষেপটি মূলত আঞ্চলিক জোটটিকে সরাসরি অপমান করার শামিল।
এদিকে, জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন মং সোয়ে গত বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে জানান, জোটের কিছু সদস্য দেশ ইতিমধ্যে ব্যক্তিগতভাবে জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তিনি নিজেই আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আসন্ন অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে যোগ দেবেন।
এরপর শুক্রবার ম্যানিলা থেকে ঘোষণা করা হয়, আগামী রবিবার ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় সেই আন-অফিসিয়াল বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর তিন মং সোয়ের ব্রিফিং শুনবেন এবং আসিয়ানের সম্পৃক্ততা নিয়ে মতবিনিময় করবেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এটিই হবে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রথম সরাসরি ও মুখোমুখি বৈঠক।





